
আদর্শ জ্বালানি, ঘরের চাল বা বেড়া তৈরী, পানের বরজ বা শিমের মাচানসহ নানাবিধ ব্যবহারে পাটকাঠির জুড়ি মেলা দায়। গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে এটি মূলত পাটখড়ি বা পাটকাঠি নামেই বহুল পরিচিত। তবে অনেকের কাছে এটি শোলা বলেও পরিচিত। গৃহস্থালি বিশেষ প্রয়োজন হওয়ায় এই পাটকাঠির চাহিদা থাকে আকাশ চুম্বী। মৌসুমী ফসল হওয়ায় সারা বছরে একবারই আহরণ করা যায় এই পাটকাঠি। তাই দৈনিক মজুরি নয় বরং পাটকাঠির বিনিময়েই আশ ছাড়িয়ে এই পাটকাঠি সংগ্রহ করেন গ্রামাঞ্চলের কৃষক এবং কৃষানীরা।
ঈশ্বরদী উপজেলার মুলাডুলি ইউনিয়নের পতিরাজপুর, বালিয়াডাঙ্গা, বাঘহাছলা, সড়াইকান্দি, আরপি বাজার, দাশুড়িয়া ইউনিয়নের মারমী, সুলতানপুর, হাতিগাড়া, কালিকাপুর, দিকশাইল, সলিমপুর ইউনিয়নের নওদাপাড়া, ভাড়ইমারী, মিরকামারী, জগন্নাথপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় চলছে সোনালী আঁশ সংগ্রহের ধুম।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ঈশ্বরদী উপজেলায় পাট চাষের লক্ষ্য মাত্রা ছিলো ৩৫৯ হেক্টর। কিন্তু গেল বছর প্রত্যাশার চাইতেও ভালো বাজার দর পাওয়ায় এ বছর কৃষক পর্যায়ে পাটের চাষ বেড়ে হয়েছে ৩৬৫ হেক্টর। এছাড়াও কৃষকদের পাট চাষে উদ্বূদ্ধ করতে কৃষি অফিস থেকে বিনা মূল্যে পাটের বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে সাধারণত তোষা ও দেশী (সাদা) এই ২ জাতের পাটের চাষ হয় সবচেয়ে বেশী । বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) বর্তমানে অনেক উচ্চ ফলনশীল পাটের নতুন জাত উদ্ভাবন করলেও বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী চাষ হয় তোষা জাতের পাট। যা শতকরা ৮০% শতাংশ বলেও জানা গেছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সকালে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার গ্রামীন সড়কের দুপাশ ও খোলা মাঠে এমনই এক দৃশ্যের দেখা মিলেছে। যেখানে সারি বদ্ধ হয়ে কৃষাণীরা সোনালী আঁশ ছড়াতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কৃষানীদের ছাড়ানো সোনালী আঁশ পাশের মজা পুকুরে ধুয়ে পরিষ্কার করছে কৃষক। পরিষ্কার করা সেই পাট রোদে শুকানোর জন্য বাড়ির আঙ্গিনায় ও খোলা মাঠে ( সে র্যের আলো লাগে এমন স্থানে) বাঁশ দিয়ে তৈরী করা আড়ে মেলে দেওয়া হচ্ছে। কেউবা সদ্য শুকানো পাট হাতা বেধে বাজারে বিক্রি ও ঘরে মজুদের কাজে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছে।
কৃষাণী বিলকিস বানু (৫৫) বলেন, মাটির চুলা জ্বালানোর জন্য এই পাটকাঠি খুব কাজে দেয়। কারন অন্যান্য খড়ি প্রথমে জ্বলতে সমস্যা করলেও পাটখড়ি দ্রুত জ্বলে যায়। তাই আমরা সারা বছরের জন্য এই পাটখড়ি সংগ্রহ করতে এসেছি। এখানে মজুরিতে নয়, আমরা কাজ করছি পাটখড়ির বিনিময়ে।
সফুরা বেগম (৫০) বলেন, প্রতি বছরই আমার ঘরের বেড়া নষ্ট হয়ে যায়। গরীব মানুষ তাই এই পাটখড়ি দিয়েই ঘরের বেড়া দেই। টাকার বিনিময়ে কাজ করলে পাটখড়ি দেবেনা মালিক। তাই পাটখড়ির বিনিময়েই কাজ করছি।
কৃষক আতাউল ইসলাম বলেন, পাট চাষে আসলে ভোগান্তিটা অনেক বেশী। এখানে পাটের পরিচর্যা থেকে শুরু করে পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আশ সংগ্রহ শুকানো সব মিলিয়ে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় এই মৌসুমে কাজের মজুরি গুনতে হয় অনেক বেশী। তবে ভালো মূল্য পেলে সব কষ্ট লাঘব হয়ে যায়। গত কয়েক দিনের তুলনায় পাটের দাম কমেছে (প্রতি মনে) ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। এভাবে কমতে থাকলে আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হব। তাই সংশ্লিটরা যদি পাটের বাজার মনিটরিং করেন এবং সিন্ডিকেট তৈরীতে বাধা দেন তাহলে আমরা কৃষকরা লাভের মুখ দেখতে পাব।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মমিন বলেন, এবার অনেক বৃষ্টি হয়েছে বলে মাঠ ঘাটসহ ছোট ছোট খালেও পানি জমেছে। যেটা পাট চাষীদের জন্য ভীষণ উপকারী হিসেবে কাজ করছে। তবে পাটের আঁশ সংগ্রহের পর রোদে শুকানোর জন্য ভালো জায়গা নির্নয় করতে হবে। এছাড়া শুকাতে দেওয়া অবস্থায় পাট না ভেজানোই ভালো। এতে করে পাটের গুনগত মান নষ্ট হয়। বাজার মূল্য বর্তমানে ওঠানামা করছে। এটা ভরা মৌসুমে করবেই । তবে মজুদ করে কিছুদিন রেখে বিক্রি করলে বেশ ভালো দাম পাওয়া যায়।




