
"সুদে টেঁয়া লই কাম ইয়ান করি আটকি গেছি। অন আঁত্তুন ওগগা হাজার টেঁয়া কম নেন। আননে নয় হাজার টেঁয়া চাইছেন, আঁই আন্নেরে আস্টে হাজার টেঁয়া দিছি।" নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার দেওটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের এক সেবাগ্রহীতা নারীর আকুতি এটি। গত কয়েকদিন থেকে নিজের জমির নামজারি করতে এসে পদে পদে হয়রানির শিকার হয়েছেন তিনি।
অবশেষে বাধ্য হয়ে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জয়নাল আবেদিনের দাবিকৃত ঘুষের টাকা নিয়ে হাজির হয়েছেন। চড়া সুদে ৮ হাজার টাকা জোগাড় করে এনেছেন তিনি। তবে ভূমি সহকারীর দাবি ৯ হাজার টাকা। এক হাজার টাকা কম হওয়ায় মানতে নারাজ ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জয়নাল আবেদিন। ঘুষের টাকা নিয়ে দেনদরবারের এমনই এক ভিডিও হাতে এসেছে এই প্রতিবেদকের।
দালালদের দৌরাত্ম আর সেবা গ্রহীতাদের হয়রানি উপজেলার দেওটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। ঘুষ ছাড়া কোন কাজ হয়না এই তহসিল অফিসে। যার নিয়ন্ত্রক জয়নাল আবেদিন। বাপ-ছেলে মিলে তারা পারিচালনা করছেন দেওটি ভূমি অফিস।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জয়নাল সিন্ডিকেটের আওতায় রয়েছে ৫ থেকে ৭ জন দালাল। যাদের গ্রীন সিগন্যাল ছাড়া ভূমি অফিসের ফাইল নড়েনা। তাদের মধ্যে অন্যতম মতিউল ইসলাম শামিম, সাহাদাত হোসেন। এছাড়া ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জয়নালের ছেলে ২২ বছরের ছেলে নাইম হোসেনও রয়েছেন এই সিন্ডিকেটে। কোন প্রকার নিয়োগ ছাড়া বাবার সাথেই অফিসে বসে কাজ করছেন নাইম। সেবা গ্রহীতাদের থেকে সরকারি নির্ধারিত ফি বাদেও নিজের খেয়ালখুশি মত অর্থ আদাই করছেন তিনি।
তথ্য অনুযায়ী, নাগরিকদের ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান, নামজারি ও মিউটেশনের আবেদন যাচাই এবং তদন্ত, সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ান (পর্চা) সংরক্ষণ ও হালনাগাদকরণ। ভূমিহীনদের খাস জমি বন্দোবস্তের তালিকা ও প্রস্তাব তৈরি। জমির সীমানা ও মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন তৈরী করা হয় তহসিল অফিস থেকে।
সরকারি ভূমি অফিসের ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, ই-নামজারির জন্য ১ হাজার ১৭০ টাকা, খতিয়ানের অনলাইন বা সার্টিফাইড কপির জন্য ১২০ টাকা, মৌজা ম্যাপের জন্য (প্রতি শিট) ৫৪৫ টাকা , খতিয়ান সংশোধন আবেদনের জন্য ২০ টাকা ফি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে সরকারি ভাবে।
তবে অনুসন্ধান বলছে, সরকারের নির্ধারিত ফি দিয়ে কোন সেবা নেওয়া সম্ভব হয়না। ঘুষ-দালাল ছাড়া সরকারি ফি দিয়ে কাজ করাতে দিনের পর দিন ঘুরতে হয় সেবা গ্রহীতাদের। অবশেষে হয়রানির শিকার হয়ে দালাল সিন্ডিকেটের দারস্থ হতে হয় ভুক্তভোগীদের। তবে এই টাকা শুধু তহসিলদার নয় উপজেলা ভূমি অফিসের প্রতিটি কর্মকর্তা ভাগ পায়।
ঘুষের টাকার দেনদরবারের সেই ভিডিওর নেপথ্যের কারন জানতে কথা হয় তহসিলদার জয়নাল আবেদিনের সাথে। ভিডিও দেখে সত্যতা স্বীকার করেন তিনি বলেন,"আমি সবাইকে বলি আমাকে কাজ দিয়েন না আমি বয়স্ক মানুষ। মাফ চাই আমি নিজের জন্য টাকা নেই না। কাজ না হলে ওই মহিলার টাকা ফিরিয়ে দিবো। এই টাকা উপজেলা ভূমি অফিসকে ভাগ করে দিতে হয়। সবাই ভাগ পায়। টাকা ছাড়া কাজ নিয়ে গেলে বলে -বিনা পয়সার কাম কিল্লাই আনছেন? মক্কেল পাঠায় দেন।"
কারা এই টাকা নেয়? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন- দেওটি তহসিল অফিস মেইনটেইন করে আনোয়ার, এভাবে নাজমুল, ফরহাদ সহ প্রত্যেকে আলাদা আলাদা তহসিল অফিস মেইনটেইন করেন। নির্ধারিত টাকা দিতে না পারলে তারা অবিশ্বাস করে। পার্টিকে ভুমি অফিসে নিয়ে যেতে বলে। এসিল্যান্ড কত পায়? এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন- আমার হাত পা বাঁধা, তবে এটুকু বলি সবাই ভাগ পায়।
এ সকল অভিযোগের বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ জসিম উদ্দিন জানান, লিখিত অভিযোগ পেলে তিনি ব্যবস্থা নিবেন।




