
নেত্রকোণার পূর্বধলা উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের নাটেরকোনা গ্রামের কৃষক কুবাদুজ্জামান বোরো মৌসুমে অনেক কষ্ট করে ধান কেটে শুকিয়ে যত্নসহকারে গোলায় তুলে রেখেছিলেন একটু বেশি দামে বিক্রির আশায়। কিন্তু সেই আশায় এখন গুড়েবালি। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে বাজারে ধানের দাম অনেক কমে গেছে। প্রতি মণ ধানের দাম প্রায় ৩০০ টাকার বেশি কমে যাওয়ায় তিনি এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন। কারণ লাভের বদলে এখন তাঁকে লোকসান গুনতে হবে।
এমন অবস্থা উপজেলার অনেক কৃষকের, যারা একটু বেশি দামে বিক্রির আশায় ধান গোলায় মজুত করে রেখেছিলেন। হোগলা ইউনিয়নের চলিতডহর গ্রামের কৃষক মো. শহিদুল ইসলাম, ধলা গ্রামের কৃষক কাজল মিয়া, জারিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক ও আব্দুল করিম বলেন, বাজারে ধান নিয়ে গেলে ব্যবসায়ীরা ধান কিনতে চান না। এক মণ ধান ফলাতে যেখানে তাঁদের খরচ হয়েছে প্রায় ৮০০ টাকা, সেখানে ৪২ কেজিতে এক মণ হিসেবে বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৯০০ টাকা দরে।
ধান কাটার ভরা মৌসুমে ভেজা ধানের দাম আর এখন শুকনা ধানের দাম প্রায় সমান হয়ে গেছে। এ অবস্থায় কৃষকেরা তাঁদের হিসাব মেলাতে পারছেন না।
কিছুদিন আগে ধানের দাম ছিল প্রতি মণ ১ হাজার ২০০ টাকার ওপরে। বর্তমানে ৩০০ টাকা কমে তা দাঁড়িয়েছে ৯০০ টাকায়। এতে কৃষকেরা হতাশ হয়ে পড়ছেন। তাঁরা বলছেন, গত বছর এ সময়ে ধানের দাম ছিল ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। এ বছর একই সময়ে তা নেমে এসেছে ৯০০ টাকায়।
কেউ কেউ দাবি করছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণকারীরা সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য সিন্ডিকেট করে বাজারে ধানের দাম কমিয়ে দিচ্ছেন। আবার স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে ধান ও চাল সরবরাহ থাকায় ধানের চাহিদা কম। ফলে দামেও ধস নেমেছে।
উপজেলা খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ বাবুল মিয়া জানান, এ বছর সরকার নির্ধারিত এক কেজি ধানের দাম ছিল ৩৬ টাকা এবং এক কেজি চালের দাম ছিল ৪৯ টাকা। গত মাসের শেষ তারিখে গুদামে বোরো ধান ও চাল সংগ্রহ শেষ হয়েছে।
সরকার নির্ধারিত দরে স্থানীয় বাজারের হিসাবে ৪২ কেজির এক মণ ধানের দাম হওয়ার কথা ১ হাজার ৫১২ টাকা। কিন্তু ব্যবসায়ীরা ধান কিনছেন ৯০০ টাকা দরে। সেই হিসাবে এক কেজি ধানের দাম পড়ে প্রায় ২২ টাকা। তবে চিকন জাতের ধানের দাম একটু বেশি।
ভুক্তভোগী কৃষক সবুজ সরকার বলেন, ধান রোপণের সময় শ্রমিকের মজুরি বেশি দিতে হয়। সার কেনার সময় সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হয়। আবার ধান কাটার সময়ও শ্রমিকের মজুরি বেশি দিতে হয়। আমরা সবকিছু সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কিনে ধান ফলালেও আমাদের উৎপাদিত ধান এখন সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এ বিষয়টি যেন দেখার কেউ নেই।
পূর্বধলা বাজারের ধান ব্যবসায়ী হাজী আব্দুল মালেক অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী আব্দুল মোমেন জুয়েল বলেন, মোকামে ধানের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় ব্যাপারীরা বেশি দামে ধান কিনতে চান না। ফলে আমরা স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও বেশি দাম দিতে পারি না।
ধানের দাম কমে যাওয়ায় মিল মালিকরাও লোকসানে পড়েছেন বলে দাবি করছেন। উপজেলার মা অটো রাইস মিল (ডায়ার)-এর স্বত্বাধিকারী মো. আব্দুল আলীম জানান, বেশি দামে কেনা ধানের দাম হঠাৎ কমে যাওয়ায় এখন চাল লোকসানে বিক্রি করতে হচ্ছে।
তবে ধানের দামের সঙ্গে খোলা বাজারে বিক্রি হওয়া চালের দামের সামঞ্জস্য না থাকায় অনেকেই নানা প্রশ্ন তুলেছেন। বাজারে ২৫ কেজির এক বস্তা মোটা চালের দাম ১ হাজার ৪০০ টাকা। সেই হিসাবে প্রতি কেজি চালের দাম পড়ে ৫২ থেকে ৫৫ টাকা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ব্যবসায়ী ও মিল মালিকেরা নানা অজুহাত দেখিয়ে ধান কেনেন কেজিপ্রতি ২২ টাকা দরে, যা সরকার নির্ধারিত ৩৬ টাকা দরের চেয়ে ১৪ টাকা কম। ধান ২২ টাকা কেজি দরে কিনলেও চালের ক্ষেত্রে তাঁরা সরকারি দরের চেয়েও বেশি দামে বিক্রি করেন। অর্থাৎ যে ধান তাঁরা ২২ টাকা কেজি দরে কেনেন, সেই ধানের চাল বিক্রি হয় ৫২ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে।
এটিকে মিল মালিকদের কারসাজি হিসেবে উল্লেখ করে এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন মহলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। এ ছাড়া সরকারি গুদামে ধান দেওয়ার সময়সীমা আরও বাড়িয়ে সারা বছর প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আহসান হাবিব জানান, সরকারি টার্গেট অনুযায়ী গত মাসে ধান-চাল সংগ্রহের সময়সীমা শেষ হয়েছে। বর্তমানে ধান ও চালের পর্যাপ্ত মজুত আছে। তাছাড়া জায়গা সংকুলান না হওয়ায় গুদামে নতুন করে ধান-চাল ঢোকানোর সুযোগও নেই। এর প্রভাবে বাজারে ধানের দাম কমছে।




