
দেশে সার নিয়ে তীব্র সংকটের কথা শোনা গেলেও সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ে সারের জন্য কৃষকদের হাহাকারই বলছে সংকটের ভিন্ন চিত্র। শুধু সংকটই নয়, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কৃষক পর্যায়ে বর্তমানে প্রতি বস্তা সারের দাম ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন একাধিক কৃষক।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আব্দুল মোমিন বলেন, বাজারে সারের তেমন সংকট নেই। বেশি দামে বিক্রির জন্য কোনো কোনো ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। অভিযোগ পেলে এসব অসাধু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে সার ডিলারদের দাবি, প্রকৃতপক্ষে সারের সংকট রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী তারাও সার পাচ্ছেন না। এর প্রভাব পড়ছে কৃষক পর্যায়ে। সংকটের সুযোগ নিয়ে খুচরা বিক্রেতারা বেশি দামে সার বিক্রি করছেন বলে জানান তারা।
আমন মৌসুমকে সামনে রেখে সার নিয়ে এমন পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। তাদের ভাষ্য, জমির চাহিদা অনুযায়ী যেখানে ছয় বস্তা সার প্রয়োজন, সেখানে দেওয়া হচ্ছে মাত্র দুই বস্তা। প্রয়োজনের সময় সার না পেয়ে দুই দিন পর সার পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ফলন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।
সরকার নির্ধারিত দামে কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি ইউরিয়া সার ২২ টাকা দরে বিক্রির কথা। সে হিসাবে ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়ার দাম ১ হাজার ১০০ টাকা। টিএসপির প্রতি কেজি ২৭ টাকা, ৫০ কেজির বস্তা ১ হাজার ৩৫০ টাকা। ডিএপির প্রতি কেজি ২১ টাকা, অর্থাৎ ৫০ কেজির বস্তা ১ হাজার ৫০ টাকা। আর এমওপি সারের প্রতি কেজি ২০ টাকা, ৫০ কেজির বস্তা ১ হাজার টাকা।
কৃষকদের অভিযোগ, টিএসপির ৫০ কেজির এক বস্তা কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। অর্থাৎ সরকারি দামের তুলনায় প্রতি বস্তায় অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা। ডিএপি (ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট) সারও বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত। এতে প্রতি বস্তায় কৃষকের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকা।
মাঠপর্যায়ের কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারের দোকানে সরকারি মূল্যে সার না পেয়ে বাধ্য হয়ে বেশি দামে খুচরা বাজার থেকে সার কিনতে হচ্ছে।
এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে (২০২৬-২৭) দেশে সারের চাহিদা বেড়ে ৬৭ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টনে দাঁড়াবে। এর মধ্যে টিএসপি ৯ লাখ ১ হাজার ৫০০ টন, ইউরিয়া ২৬ লাখ ২২ হাজার টন, এমওপি ৯ লাখ ৭০ হাজার টন এবং ডিএপি ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭০০ টন।
এ ছাড়া এনপিকেএস (নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশ ও সালফারের সুষম সার), জিপসাম, জিংক সালফেট, বোরন, অ্যামোনিয়াম সালফেট ও ম্যাগনেসিয়াম সালফেটের চাহিদা ৯ লাখ ২১ হাজার ৩০০ টন নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে, অর্থাৎ ৩১ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ ৮৬ হাজার ১০০ টন সার মজুত রয়েছে।
এর মধ্যে টিএসপি ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৯০০ টন, ইউরিয়া ৪ লাখ ১৩ হাজার ৭০০ টন, এমওপি ১ লাখ ৩৮ হাজার টন এবং ডিএপি ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৫০০ টন।
গত বছরের একই সময়ে মোট মজুত ছিল প্রায় ১২ লাখ টন। অর্থাৎ গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এবার মোট মজুত প্রায় ৮৬ হাজার ১০০ টন বা ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ বেড়েছে।
ঈশ্বরদী উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষক ও খুচরা সার বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টিএসপি সার আগে প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৫২ টাকা দরে বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ৬২ টাকা। ইউরিয়া ২০ থেকে ২৫ টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে ৩৩ টাকা, ডিএপি দেশি ৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ৪৫ টাকা এবং পটাশ (এমওপি) ৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৩৫ টাকা হয়েছে। ১৪ কেজির এক বস্তা জিপসামের দাম আগে ছিল ১২০ টাকা, যা বর্তমানে বেড়ে ২২০ টাকা হয়েছে। সালফারের দাম ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ৩৫ টাকা হয়েছে। এ ছাড়া কীটনাশকের বাজারমূল্যও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মোমিন বলেন, সারা দেশেই সারের কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে। তবে এটি মূলত বণ্টনব্যবস্থার কারণে হচ্ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে এই মৌসুমে সারের প্রয়োজন না থাকলেও সেখানে সমপরিমাণ সার পাঠানো হচ্ছে। ফলে সেগুলো অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ঈশ্বরদীতে সার বিতরণে কঠোর নজরদারি রাখা হয়েছে। গত কয়েক দিনের তুলনায় এখন কৃষকেরা বেশি সার পাচ্ছেন। আশা করা যায়, পরিস্থিতি দ্রুতই স্বাভাবিক হয়ে যাবে।




