
লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে জোড়া খুনের মামলা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টার প্রতিবাদে ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী মানববন্ধন করেছেন। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) উপজেলার চর বাদাম ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব চর কলাকোপা গ্রামের চৌরাস্তার মোড়ে এ মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। এতে ভুক্তভোগী পরিবারসহ এলাকার কয়েক শ নারী-পুরুষ অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন রাশেদার মা আংকুরি বেগম, স্থানীয় ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আসলাম, আতাউর রহমান হেলাল ও হাজী আব্দুল মালেক। এ সময় বক্তারা রাশেদার স্বামী জাকির হোসেন সুমনের পরিবারের উদ্দেশ্যমূলক ও পরিকল্পিতভাবে অপহরণের নাটক সাজিয়ে দায়ের করা ‘মিথ্যা’ মামলা প্রত্যাহার এবং গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের মুক্তির দাবি করেন। একই সঙ্গে দ্রুত ঘটনা তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং খুনির ফাঁসির দাবি জানান তাঁরা।
২০২৩ সালের আলোচিত ঘটনায় স্ত্রী রাশেদা ও শ্বশুর আবুল বাশার নিজ ঘরে চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের শিকার হন। এ ঘটনায় রাশেদার বড় ভাই মো. জুয়েল বাদী হয়ে ওই বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর রামগতি থানায় জাকির হোসেন সুমনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় সুমন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
প্রায় দুই বছর পর সুমনের বাবা জয়নাল আবদীন বাদী হয়ে জুয়েল, তাঁর ভাই হারুনসহ চারজনের বিরুদ্ধে গত শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) রামগতি থানায় দণ্ডবিধির ৩৬৫, ৩২৩, ৩২৫, ৩৭৯, ৩০৭ ও ৫০৬ ধারায় মামলা করেন। ওই দিন রাতেই বাদী জুয়েল ও তাঁর ভাই হারুনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
বিষয়টি জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও জয়নাল আবদীনকে পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর দায়ের করা মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুরের দালাল বাজার এলাকার জয়নাল আবদীনের ছেলে সৌরভ হোসেন গত ২৭ আগস্ট তাঁর মেজো ভাইয়ের কাছ থেকে ব্যবসা করার জন্য নগদ ১ লাখ টাকা এবং সিটি ব্যাংকের লক্ষ্মীপুর শাখার হিসাবের ২ লাখ টাকার একটি চেক নেন। ওই চেক নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
এ ঘটনায় তাঁর বাবা জয়নাল আবদীন ২৮ আগস্ট লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানায় ১৫৭১ নম্বরে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরদিন ২৯ আগস্ট ভোর ৫টা ৪০ মিনিটে একটি ফোনকলের মাধ্যমে তাঁরা জানতে পারেন, সৌরভ বিমর্ষ অবস্থায় রামগতি উপজেলার চর বাদাম ইউনিয়নের ভোলার বাপের মসজিদসংলগ্ন একটি বিলে পড়ে আছেন। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সুস্থ হওয়ার পর সৌরভ জানান, তিনি ওই টাকা নিয়ে রামগতির চর বাদাম ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে তাঁর খালার বাড়িতে যান। গরু কিনতে এসেছেন বলে খালাকে জানান। ২৮ আগস্ট রাত সাড়ে ৮টার দিকে খালার বাড়ির পাশের কলোনি বাজারে চা খেতে যান তিনি। চা খাওয়ার পর কলোনিপোলসংলগ্ন সড়কের ওপর এক সহপাঠীর সঙ্গে বসে মুঠোফোন ব্যবহার করছিলেন। এ সময় জুয়েল, হারুনসহ চার ব্যক্তি অটোরিকশায় এসে তাঁর চোখ-মুখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, সেখানে তাঁকে মারধর করে সঙ্গে থাকা ৩ লাখ টাকা, রেডমি ১৩ প্রো মডেলের মুঠোফোনসহ অন্যান্য জিনিস নিয়ে তাঁকে ফেলে যাওয়া হয়। সৌরভের খালার বাড়ির পাশেই জুয়েল ও হারুনদের বাড়ি। তাঁদের মধ্যে আগে থেকেই পারিবারিক বিরোধ রয়েছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে ঘটনাস্থলে হুঁশ ফেরার পর সৌরভ বুঝতে পারেন, তাঁর কাছে থাকা টাকা ও মুঠোফোন নেই। এ ঘটনায় সৌরভের বাবা জয়নাল আবদীন শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রামগতি থানায় জুয়েল-হারুনসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ওই মামলায় হারুন ও জুয়েলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
উল্লেখ্য, লক্ষ্মীপুরের দালাল বাজার এলাকার জাকির হোসেন সুমনের সঙ্গে রামগতি উপজেলার চর বাদাম ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আবুল বাশারের মেয়ে রাশেদার পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের পর তাঁদের একটি পুত্রসন্তান জন্ম নেয়। পারিবারিক কলহ ও যৌতুকের দাবিসহ নানা কারণে ২০২৩ সালের আগস্টে রাশেদা সুমনকে তালাক দেন। পরে তিনি অন্যত্র বিয়ে করেছেন—এ খবর শুনে সুমন ক্ষিপ্ত হন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
এরপর ২০২৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে সুমন রামগতিতে এসে ধারালো ছুরি নিয়ে গোপনে রাশেদার ঘরে ঢুকে তাঁকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর আহত করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। তাঁর চিৎকার শুনে বাবা আবুল বাশার এগিয়ে এলে তাঁকেও উপর্যুপরি কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। এ সময় রাশেদার মা আংকুরি বেগম তাঁকে ধরতে গেলে তাঁকেও কুপিয়ে সুমন পালিয়ে যান বলে অভিযোগ করা হয়।
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে রাশেদা ও তাঁর বাবা আবুল বাশার ঘটনাস্থলেই মারা যান। খবর পেয়ে আশপাশের লোকজন পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে এলাকাবাসীর সহায়তায় ছুরিসহ সুমনকে গ্রেপ্তার করে। জুয়েল ওই সময় বাড়িতে ছিলেন না। পরদিন বাড়িতে এসে ঘটনা জানতে পেরে তিনি বাদী হয়ে রামগতি থানায় সুমনের বিরুদ্ধে জোড়া খুনের মামলা করেন।
জুয়েলের মা আংকুরি বেগম জানান, গত কিছুদিন ধরে সুমনের পরিবারের লোকজন ৫ লাখ টাকা দিয়ে মামলা নিষ্পত্তি করে তাঁকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এতে তাঁরা রাজি হননি। সুমনকে জামিন করাতে না পেরে পরিকল্পিতভাবে নাটক সাজিয়ে তাঁর ছেলেদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আংকুরি বেগম বলেন, ‘আমরা প্রশাসনকে বলব, এ ধরনের মিথ্যা সাজানো নাটকের ফাঁদে পা না দিয়ে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে খুনির শাস্তির ব্যবস্থা করুন। একই সঙ্গে মিথ্যা মামলায় হয়রানি না করে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।’
রামগতি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিটন দেওয়ান জানান, গত ৪ সেপ্টেম্বর জয়নাল আবদীন বাদী হয়ে জুয়েল-হারুনসহ চারজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। অভিযান চালিয়ে মামলার আসামি জুয়েল ও হারুনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাদীর অভিযোগ তদন্তে উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মাহবুব মোরশেদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে আদালতে সার্চিট (চার্জশিট) দেওয়া হবে।




