
নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ৩১ জনের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। সেপ্টেম্বর মাসেই একদিনের ব্যবধানে দুইজন গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছেন। এ সময়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন আরও অনেকে। নিহতদের মধ্যে তরুণ-তরুণী, শিক্ষার্থী ও গৃহবধূর সংখ্যা বেশি। বিষপান ও গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনাই বেশি ঘটেছে। যেগুলোর কিছু জানা গেলেও অনেক ঘটনা জানা যায় না।
উপজেলার পশ্চিম মীরাপাড়া গ্রামের জনৈক হারুনের সঙ্গে বেশ কিছুদিন ধরে পারিবারিক কলহ চলছিল স্ত্রী সাহিদার (২২)। এরই জের ধরে সহিদা তাঁর দেড় বছর বয়সী একমাত্র ছেলেকে বিষপান করিয়ে নিজেও বিষপান করেন। বিষপান করানোর কিছু পরেই মারা যায় ছোট্ট শিশুটি। আর সহিদা চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিছুদিন পর মারা যান। ঘটনাটি ঘটেছে গত ২২ জুলাই।
বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর পালন করা হয় বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। দিবসটির এবছরের প্রতিপাদ্য হলো — “আত্মহত্যা বিষয়ক প্রচলিত ধারণা পরিবর্তন”।
নিয়ামতপুর থানা ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলায় ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে ৩১ জন আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। গড় হিসাবে প্রতি মাসে তিনজনের বেশি আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে কম বয়সী তরুণ-তরুণী, শিক্ষার্থী ও গৃহবধূর সংখ্যাই বেশি। অধিকাংশ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বিষপান ও ফাঁসিতে ঝুলে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাংসারিক মনোমালিন্য, পরীক্ষায় অকৃতকার্য, মোবাইল ফোন কিনে না দেওয়া, প্রেমঘটিত বিষয়ে মা-বাবার বাধা, মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে নিষেধ করা, পারিবারিক কলহ, মাদকাসক্তি ও মানসিক অবসাদ—এসব আত্মহত্যার মূল কারণ। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট পরিবারের সঙ্গে কথা বলে আত্মহত্যার এসব কারণ ওঠে এসেছে।
এলাকার সচেতন মহল বলছে, নগণ্য বিষয়েও লোকজন আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। বিষয়টি অবশ্যই উদ্বেগের। তবে যথাসময়ে মনোবিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে আত্মহত্যার প্রবণতা থেকে ফেরানো সম্ভব।
স্থানীয় ও থানা সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিষপানে আত্মহত্যা করেন গৃহবধূ স্মৃতি কর্ণী (২৫)। একদিনের ব্যবধানে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন গৃহবধূ অনিতা বর্মন (৫৫)।
এছাড়া চলতি বছরের ২৯ জুলাই ভোরে দিলীপ মিনজ (২২) কে অসুস্থ অবস্থায় নিয়ামতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসা হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসক জানান, তাঁর মুখে বিষের গন্ধ পাওয়া গেছে। ১ জুন স্বামীর সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে শারমিন আক্তার (৩০) নামের এক গৃহবধূ ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেন। একই কারণে ১৩ মে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেন গৃহবধূ শ্রাবন্তী (১৭)। ভাইয়ের সাথে টিভি দেখা নিয়ে কথা কাটাকাটি হয় কলেজ শিক্ষার্থী সুমনা দাসের (১৭)। ভাইয়ের উপর অভিমান করে আত্মহননের পথ বেছে নেয় সে। ১৮ এপ্রিল পারিবারিক কলহের জের ধরে মা-বাবার উপর অভিমান করে আত্মহত্যা করে কলেজ শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান (১৮)।
এছাড়াও গত ২৯ আগস্ট পারিবারিক কলহের জেরে এক কৃষক বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। নিয়ামতপুরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। আর এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে এক পরীক্ষার্থী গত ১০ আগস্ট বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে পরিবারের লোকজন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসে।
নিয়ামতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফয়সল নাহিদ বলেন, প্রতি মাসেই একাধিক আত্মহত্যার চেষ্টাকারী রোগী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসে। এদের বেশিরভাগই বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। তাদেরকে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া হয়। অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যান। চিকিৎসা শেষে আত্মহত্যা প্রতিরোধ বিষয়ে রোগীকে ও পরিবারের সদস্যদের সচেতন করা হয়।
এ বিষয়ে নিয়ামতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান পিপিএম বলেন, উপজেলায় কয়েক মাসে বেশ কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। সাংসারিক সামান্য মনোমালিন্য, কথা-কাটাকাটি থেকে রাগ-অভিমান করে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। বিষয়টি অবশ্যই উদ্বেগের। আত্মহত্যা প্রতিরোধে বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনসাধারণের মাঝে সচেতনতার বৃদ্ধির কাজ করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
নিয়ামতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুর্শিদা খাতুন বলেন, প্রত্যেক মানুষের কাছে তার জীবন মূল্যবান।আত্মহত্যা প্রতিরোধে সবার আগে নিজের জীবনকে ভালোবাসতে হবে। এর পাশাপাশি দরকার সচেতনতা। আত্মহত্যা প্রতিরোধে উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম জোরদার করা হবে বলে তিনি জানান।




