
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধী দলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান বলেছেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও শাসনতান্ত্রিক পাহারাদারি করাই বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব। শনিবার সকাল ১০টায় বগুড়া শহরের এক অভিজাত মিলনায়তনে স্থানীয় ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় কর্মরত সাংবাদিকদের সাথে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।
মতবিনিময় সভায় ড. শফিকুর রহমান দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণআকাঙ্ক্ষা, উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বগুড়ার অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীন ভূমিকার নানা দিক তুলে ধরেন।
ঢাকা থেকে রংপুরগামী রোডশো কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "রাস্তায় লাখো মানুষের ঢল নামলেও আল্লাহর রহমতে কোথাও সামান্যতম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়নি। আমরা অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে প্রতিটি কর্মসূচি পালন করছি।" তিনি আরও যোগ করেন, কেবল ঘরে বসে থাকলে অধিকার আদায় হয় না; জনগণকে স্বাধিকার সচেতন করতে রাজনৈতিক দলকে রাজপথে ভূমিকা রাখতে হবে। তবে রাজপথের আন্দোলনের কারণে যাতে সাধারণ মানুষের চলাচলে কোনো দুর্ভোগ না হয়, সে বিষয়ে দল সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে বলে জানান তিনি।
বিগত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকে "স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদের রাজত্ব" বলে অভিহিত করে জামায়াত আমীর বলেন, এই দীর্ঘ সময়ে অসংখ্য মানুষকে গুম করা হয়েছে, পরিবারগুলো তাদের স্বজনদের ফিরে পাওয়ার প্রতীক্ষায় তছনছ হয়ে গেছে। এই রক্তক্ষয়ী ট্রমা ও কষ্ট বুক থেকে মুছে চব্বিশের গণবিপ্লব দেশের শাসনতন্ত্রে এক আমূল পরিবর্তন আনবে।
তিনি কঠোর ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, দেশের আশাতীত ৯২% মানুষ গণভোটে 'হ্যাঁ'-এর পক্ষে অবস্থান নিয়ে ব্যাপক সংস্কারের রায় দিয়েছিল। কিন্তু নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই সেই ওয়াদার বরখেলাপ করেছে এবং জনগণের দেয়া রায়ের তোয়াক্কা করছে না। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করে বলেন, জনগণের ভোটের রায়কে অবহেলা বা অবমাননা করার পরিণতি কখনোই ভালো হয় না।
সংবাদকর্মীদের উদ্দেশ্যে ড. শফিকুর রহমান বলেন, সংবিধান স্বীকৃত তিন বিভাগ—আইন, বিচার ও নির্বাহীর বাইরে সংবাদ মাধ্যম হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী 'চতুর্থ স্তম্ভ'। যদি মিডিয়া স্বচ্ছ ও সততার জায়গায় অটল থাকে, তবে রাষ্ট্রের বাকি তিনটি বিভাগও সোজা পথে চলতে বাধ্য হয়।
সাংবাদিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি আরও অনুরোধ জানান, যেন কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য কাটছাঁট বা খণ্ডিতভাবে প্রচার করে মূল ভাববস্তু বদলে দেওয়া না হয়। বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাই একটি জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
উত্তরের ঐতিহাসিক শহর বগুড়ার করুণ দশা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ড. শফিকুর রহমান বলেন, বগুড়াকে উত্তরবঙ্গের রাজধানী এবং 'সাতমাথা'কে যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু বলা হলেও ৫৪ বছরে এই জেলা চরম অবহেলার শিকার হয়েছে। এক সময়ের শিল্পনগরী ও শিক্ষানগরী বগুড়ায় একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো আধুনিক অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।
তিনি নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ভবের বাজার ও পোড়াদহ টেক্সটাইল রোডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর বেহাল অবস্থা বগুড়াবাসীর প্রতি দীর্ঘদিনের বৈষম্যের প্রমাণ। সাবেক ক্ষমতাসীনদের প্রতিষ্ঠাতা কিংবা একাধিক শাসনামল থাকা সত্ত্বেও বগুড়া কেন উপেক্ষিত থাকল তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি এবং বগুড়ার হারানো গৌরব ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
বক্তব্যের শেষভাগে তিনি জানান, সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের প্রধান মুখপাত্র হিসেবে তিনি কেবল একক কোনো আসনের প্রতিনিধিত্ব করেন না। ভোলা, সাতক্ষীরা, খুলনা, যশোর কিংবা তিস্তাপাড়ের মানুষের পানি ও মৌলিক অধিকারের কথা যেমন তিনি তুলে ধরেছেন, একইভাবে বগুড়াসহ গোটা উত্তরবঙ্গের সার্বিক বৈষম্য দূর করতেও তিনি সংসদে সোচ্চার থাকবেন।
সমাপনীতে তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত ও বেকারত্বহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং উপস্থিত সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়ে অন্যান্য নির্ধারিত কর্মসূচির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।




