
বয়স ২৩ বছর। এই বয়সে পড়াশোনা, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ গড়ার কথা। কিন্তু মিম আক্তারের জীবনে বাস্তবতা ভিন্ন। পরিবারের খাবারের জোগান দিতে প্রতিদিন পায়রা নদীতে জাল ফেলতে হয় তাঁকে। নদীতে মাছ মিললে সেদিনের খাবারের ব্যবস্থা হয়, না মিললে অপেক্ষা করতে হয় পরের দিনের জন্য।
বরগুনার আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মিম। তাঁর বাবা মারা গেছেন বহু বছর আগে। এরপর মায়েরও অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়। কয়েক বছর আগে স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ছয় বছরের মেয়েসহ পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে মিমের কাঁধে। পরিবারের একজন সদস্য বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ভাই। আরেক ছোট ভাইয়ের দেখভালের দায়িত্বও তাঁকেই নিতে হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি জরাজীর্ণ ঘরে মেয়ে ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থাকেন মিম। সংসারে স্থায়ী কোনো আয় নেই। খাবার, চিকিৎসা ও পোশাকের খরচ জোগানোর পাশাপাশি মেয়ের পড়াশোনার ব্যয় বহন করাও তাঁর জন্য কঠিন। অর্থের অভাবে মেয়ের নিয়মিত পড়াশোনা হচ্ছে না। ছোট ভাইয়ের পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে গেছে।
জীবিকার একমাত্র অবলম্বন পায়রা নদীতে মাছ ধরা। কখনো ভোরে, কখনো বিকেলে, আবার কখনো রাতেও নদীতে নামতে হয় তাঁকে। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা নদীর উত্তাল ঢেউ-জীবিকার তাগিদে কোনো কিছুই তাঁকে ঘরে আটকে রাখতে পারে না।
মিম বলেন, নদীতে মাছ পাওয়া গেলে সেদিন পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা হয়। মাছ না পেলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। স্থায়ী কোনো আয়ের ব্যবস্থা থাকলে ঝুঁকি নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে হতো না।
মিমের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন তাঁর মেয়েকে পড়াশোনা করানো। অভাবের কারণে নিজের মতো করে যেন মেয়েকেও জীবন কাটাতে না হয়, সেটিই তাঁর চাওয়া। ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ারও ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।
মিম বলেন, সরকারি সহায়তা, প্রশিক্ষণ কিংবা বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে তিনি নদীতে মাছ ধরা ছেড়ে অন্য কোনো কাজ করতে চান। এতে পরিবারের খরচ চালানোর পাশাপাশি সন্তান ও ভাইয়ের পড়াশোনার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করেন তিনি।
গুলিশাখালী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. খোকন মিয়া বলেন- মিম তেমন কোনো সরকারি সহযোগিতা পান না। জেলেদের জন্য সরকারি যে সহায়তা রয়েছে, সেটিও তিনি তেমন পান না। তাঁর পরিবারের বিষয়টি বিবেচনা করে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে মিমের পরিবার উপকৃত হবে।
পায়রা নদীর ওপর নির্ভর করেই চলছে মিমের সংসার। প্রতিদিন নদীতে জাল ফেলেন তিনি, কিন্তু সেই জালে শুধু মাছ নয়, ধরা পড়ে তাঁর পরিবারের বেঁচে থাকার প্রত্যাশাও। নিরাপদ জীবিকা ও সরকারি সহায়তা পেলে ঝুঁকিপূর্ণ এই জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে চান ২৩ বছরের এই নারী।




