
গাজীপুরের জয়দেবপুরে খালের পানিতে সুটকেস ও প্লাস্টিকের বস্তায় ভাসমান দ্বিখণ্ডিত ও অর্ধগলিত নারীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পাঁচ বছরের প্রেমের সম্পর্ক, বিয়ে নিয়ে বিরোধ ও পূর্বের ক্ষোভের জেরে ডলি আক্তার (৩০) নামে ওই নারীকে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। পরে পরিচয় গোপন ও লাশ গুমের উদ্দেশ্যে তার লাশ কোমর থেকে দ্বিখণ্ডিত করে একাংশ সুটকেসে এবং অন্য অংশ প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে খালের পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় নিহতের প্রেমিক মিশন ইসলাম (২২), তার মা বানু আক্তার (৪৩) এবং সহযোগী মিজানুর রহমান মিল্টনকে (২৪) গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। পুলিশের ভাষ্য, গ্রেপ্তার তিনজনই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
আজ সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) গাজীপুর মহানগরের রাজদীঘির উত্তর পাড়ে পিবিআই গাজীপুর জেলা কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার।
পুলিশ জানায়, ডলি আক্তার ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থানার পাহাড়পাবিজান গ্রামের বাদশা মিয়ার মেয়ে। স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর তিনি গাজীপুরের জয়দেবপুর থানাধীন বানিয়ারচালা মেম্বারবাড়ী এলাকায় ভাড়া বাসায় একা থাকতেন। বাঘের বাজার এলাকার গোল্ডেন রিপিট গার্মেন্টসে সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন তিনি।
গত ১১ সেপ্টেম্বর বিকেলে জয়দেবপুর থানাধীন ভবানীপুর এলাকার হামজা অ্যাপারেলস লিমিটেডের উত্তর পাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম পাশের একটি খালে সুটকেস ও প্লাস্টিকের বস্তা ভাসতে দেখেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুটকেস ও বস্তার ভেতর থেকে এক নারীর খণ্ডিত ও অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে।
ঘটনাটি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পিবিআই গাজীপুর জেলা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ছায়া তদন্ত শুরু করে। পিবিআইয়ের ক্রাইমসিন টিম ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় সূত্রের মাধ্যমে শুরু হয় অনুসন্ধান। তদন্তের একপর্যায়ে নিহতের পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের ঘটনাও উদ্ঘাটন করে পিবিআই।
যেভাবে হত্যা
আসামির জবানবন্দির বরাত দিয়ে পিবিআই জানায়, ওই রাতে ডলিকে ঘুমের ও অ্যালার্জির ওষুধ খাওয়ানো হয়। তিনি ঘুমিয়ে পড়ার পর রাত আনুমানিক ২টার দিকে মিশন লুঙ্গি দিয়ে তার গলায় পেঁচিয়ে এবং পরে বালিশ দিয়ে মুখ চেপে শ্বাসরোধে হত্যা করেন।
এরপর লাশটি চৌকির নিচে লুকিয়ে রাখা হয়। পরদিন সকালে ঘর পরিষ্কার করার সময় বানু আক্তার চৌকির নিচে ডলির লাশ দেখতে পান। পরে লাশ গুমের পরিকল্পনা করা হয়।
মিশন একটি সুটকেস সংগ্রহ করেন। কিন্তু পুরো লাশ সুটকেসে না ধরায় ব্লেড ও বঁটি-দা দিয়ে কোমর থেকে লাশ দ্বিখণ্ডিত করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। লাশের একাংশ সুটকেসে এবং অপরাংশ পলিথিনে মুড়িয়ে প্লাস্টিকের বস্তায় রাখা হয়।
এরপর মিশন তার বন্ধু মিজানুর রহমান মিল্টনকে বাসা পরিবর্তনের কথা বলে ডেকে আনেন। মিল্টন এসে সুটকেস ও বস্তা অটোরিকশায় তুলে দিতে সহযোগিতা করেন।
পিবিআই জানায়, পরে মিশন, তার মা বানু আক্তার ও মিল্টন মিলে সুটকেস ও বস্তা নিয়ে প্রথমে রাজেন্দ্রপুরে যান। সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশায় ভবানীপুর এলাকায় যান তারা। পরে ভবানীপুর ব্রিজ এলাকার কাছ থেকে মিশন ও মিল্টন সুটকেস ও বস্তা খালের পানিতে ফেলে দেন।
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় মিল্টনের হাতে রক্ত লাগলে সুটকেস ও বস্তার ভেতরে কী রয়েছে জানতে চান তিনি। একপর্যায়ে মিশন তাকে জানান, সেখানে তার প্রেমিকা ডলি আক্তারের লাশ রয়েছে। এরপর তারা নিজ নিজ বাসায় ফিরে যান।




