
কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তিন ব্যক্তিকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক হিসেবে জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে যে প্রচার চালানো হয়েছে, অনুসন্ধানে তার সত্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। তাছাড়া অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি জন্মসনদের বিষয়ে অভিযোগকারীর। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই তিনজনই বাংলাদেশের নাগরিক এবং তাদের পারিবারিক শিকড় কক্সবাজারে।
এ ছাড়া যে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ করা হয়েছে, সেটির অস্তিত্ব ও সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় তথ্য যাচাই করে ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাছাড়া অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি জন্মসনদের বিষয়ে জেলাপ্রশাসক বরাবর অভিযোগকারী শফিউল আলমের ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কুমিল্লা দেবিদ্বার উপজেলা ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তিন ব্যক্তির জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে। প্রচার করা হয়, তারা মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্য এবং তাদের নামে জন্মসনদ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন তদন্তে নামে। পরে ওই তিন ব্যক্তির ফতেহাবাদ ইউনিয়নে স্থায়ী বসবাসের তথ্য না পাওয়ায় সাবেক ইউপি সচিব মো. নজরুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তবে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন তথ্য। জন্মসনদে উল্লেখিত তিন ব্যক্তি হলেন, মুবিনা খাতুন, হাফিছা এবং সাইমুন ইসলাম সাজ্জাদ। তাছাড়া জন্ম নিবন্ধন পাওয়া আবু হেনা সিদ্দিকী ইশমাম, জুনাইরা আফরিন আঁখি, নূর মামিন, মাজেদের স্থায়ী ঠিকানা কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকায়। তারা কেউই মিয়ানমারের নাগরিক নন বলে তাদের স্বজন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।
মুবিনা খাতুনের মা নুরজাহান বেগম বলেন, আমার সাবেক স্বামী আবুল কাশেম অনেক বছর আগে মারা গেছেন। আমার মেয়ে মুবিনাও সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আমরা মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা নই। আমার জন্ম কক্সবাজার সদরে। আমার বাবা-ভাই সবাই এ দেশের নাগরিক। আমার মেয়েও জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক।
কক্সবাজার সদর উপজেলার ভারুয়াখালী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুরুল আমিন কাজল বলেন, হাফিছা, আবু হেনা সিদ্দিকী ইশমাম, জুনাইরা আফরিন আঁখি, আমার প্রতিবেশী। ওরা আমার ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা। চেয়ারম্যান না থাকায় এলাকায় সাধারণ নাগরিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ কারণে অনেকে বাধ্য হয়ে অন্য এলাকা থেকে নাগরিক সনদ বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে সমস্যার সমাধান করছেন।
সাইমুন ইসলাম সাজ্জাদের বাবা রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার ছেলে আবুধাবিতে থাকে। জরুরি প্রয়োজনে ডিজিটাল জন্মসনদ প্রয়োজন হওয়ায় সে পরিচিত একজনের মাধ্যমে জন্মসনদ তৈরি করে। আমরা মিয়ানমারের নাগরিক নই। আমাদের পূর্বপুরুষ জন্মসূত্রে মহেশখালীতে বসবাস আমরা বাংলাদেশের নাগরিক।
ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ডিজিটাল সেন্টারের সাবেক উদ্যোক্তা আসাদুজ্জামান রাজিব আমাকে জিম্মি করে জোরপূর্বক আমার কাছ থেকে কাজ করিয়ে নিতো, আমি ছুটিতে থাকা কালীন রাজির নাগরিকদের সমস্যার কথা বলে বিভিন্ন সময় আমার কাছ থেকে ওটিপি নিয়ে বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের জন্ম সনদ দেয় যা পরবর্তীতে আমি জানতে পারি। আমি ঘটনান নিরপেক্ষ তদন্ত চাই এবং আইন অনুযায়ী তার শাস্তির দাবি করি।
সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. সালাহ উদ্দিন রুহুল দৈনিক বাংলাদেশ বুলেটিন কে বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে আমি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করলেও জন্মনিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনার ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড পাই ২০ জানুয়ারি ২০২৫ সালে। অথচ আলোচিত জন্মনিবন্ধনগুলো তৈরি হয়েছে ৪ জানুয়ারি ২০২৫। অর্থাৎ আমি ইউজার এক্সেস পাওয়ার আগেই এগুলো তৈরি করা হয়েছে। কারা, কীভাবে এবং কোন আইডি ব্যবহার করে এসব জন্মনিবন্ধন করেছে, তা আমার জানা নেই।
এ বিষয়ে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক রোজি আক্তার দৈনিক বাংলাদেশ বুলেটিন'কে বলেন, ইস্যু করা জন্ম নিবন্ধ সনদ কোন রোহিঙ্গাকে দেওয়া হয়েছে কি না তা তদন্ত চলছে, তদন্তে অপরাধী প্রমানীত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




