
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপি বলেছেন, গণভোটের রায় অস্বীকার করে বর্তমান শাসকদল বিএনপি স্বৈরাচারী কায়দায় ক্ষমতাচ্যুত ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পথেই হাঁটা শুরু করেছে। এভাবে জনগণের দাবি উপেক্ষা করতে থাকলে বিএনপির পরিণতি আওয়ামী লীগের মতোই হবে। আওয়ামী লীগ তো পালানোর মতো জায়গা পেয়েছিল, কিন্তু বিএনপির পালানোর জায়গাটুকুও মিলবে না।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টায় বগুড়ার একটি মিলনায়তনে ১৯ মার্চের ১১ দলীয় জোটের ঢাকা-রংপুর লংমার্চ সফল করার লক্ষ্যে আয়োজিত সাংবাদিকদের প্রেসব্রিফিংয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সংসদে গণভোটের রায় ও সংবিধান সংস্কারের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জামায়াতের এই নায়েবে আমীর বলেন, “জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে ১৭ই ফেব্রুয়ারি শপথ নেয়ার সময় আমাদের দুটি কাগজ দেওয়া হয়েছিল—একটি সংসদ সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। আমরা ১১ দলীয় জোটের বিজয়ী সংসদ সদস্যরা দুটিরই শপথ নিয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ক্ষমতাসীন দল বিএনপি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেনি।”
তিনি আরও বলেন, “তারা নানা তালবাহানা করে সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে। অথচ সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হলে তো আওয়ামী লীগই ২৯-৩০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার কথা ছিল। তবে কিসের বলে তারা ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হলো? উত্তর একটাই—জনগণের রায়। জনগণের জন্যই সংবিধান, সংবিধানের জন্য জনগণ নয়। সেই জনগণ যখন গণভোটে স্পষ্ট রায় দিয়েছে, তখন নানা অজুহাতে তা পাশ কাটিয়ে চলা জনগণকে প্রতারণা করা ছাড়া আর কিছুই নয়।”
সংসদে বিএনপির ভূমিকা ও সাম্প্রতিক আইনের তীব্র সমালোচনা করে এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, “আমরা সংসদে গিয়ে সংবিধান সংস্কারের কথা বলেছি, কিন্তু তারা 'সংবিধান সংশোধনের' কথা বলছে। আমরা তো সংবিধান সংশোধনের জন্য গণভোটে রায় দিইনি। নিয়মিত সরকার যেকোনো সামাজিক ইস্যুতে সংবিধান সংশোধন করতে পারে, যার আইনগত ভিত্তি হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জের ঝুঁকিতে থাকে। কিন্তু জনগণের রায়ে যে সংবিধান সংস্কার হয়, তা স্থায়ী হয় এবং কোনো আদালতে তা চ্যালেঞ্জ করে বাতিল করা যায় না। দেশ ১৮-২০ কোটি মানুষের ইচ্ছায় চলবে, কোনো ব্যক্তি বা দলের খেয়ালখুশিমতো নয়।”
তিনি অভিযোগ করেন, জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরাতে সরকার সম্প্রতি সংসদে ‘গুম’ ও ‘ইনডেমনিটি বিল’ নামে দুটি আইন পাস করেছে, যা আওয়ামী সরকারের আইনের চেয়েও ভয়াবহ। এর মাধ্যমে মূলত গুমকে আরও উৎসাহিত করা হবে এবং সুষ্ঠু বিচার পাওয়া থেকে মানুষকে বঞ্চিত করা হবে।
এছাড়া ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী আইন পাস করার সমালোচনা করে তিনি বলেন, “সরকার ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কুরআন-হাদীস পরিপন্থী কোনো আইন করবে না। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে তারা সেই ওয়াদা ভঙ্গ করেছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও দেশের হাক্কানী আলেমদের মতামত না নিয়েই আইন করা হয়েছে, যা সরাসরি ধর্ম নিয়ে রাজনীতির শামিল।”
সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, “একজন সর্বজান্তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সব মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে নিজের মন্ত্রণালয়ের কথাই ভুলে গেছেন। তিনি জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান উন্নতিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।”
সংবাদ সম্মেলনে অবিলম্বে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গণহত্যার দ্রত দৃশ্যমান বিচার ও রায় কার্যকর, বিদ্যুৎ-গ্যাস-জ্বালানি তেল ও কৃষি খাতের সার সংকট দূরীকরণ, বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা এবং সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ ও স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অবসানের জোর দাবি জানানো হয়।
প্রেসব্রিফিং থেকে জানানো হয়, ১১ দলীয় জোটের ঢাকা থেকে শুরু হওয়া রংপুরগামী লংমার্চটি আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টায় বগুড়ার মাটিডালী বিমানমোড়ে এক বিশাল সমাবেশে মিলিত হবে। উক্ত সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন এনসিপির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক এবং এলডিপির সভাপতি ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীরবিক্রম।
বগুড়া মহানগরী জামায়াতের আমীর অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেলের উপস্থাপনায় প্রেসব্রিফিংয়ে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন—বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন, বগুড়া জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হক সরকার, বগুড়া অঞ্চল টিম সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, অধ্যাপক আব্দুল হালিম বেগ, বগুড়া মহানগরী জামায়াতের সেক্রেটারি ও জামায়াত মনোনীত বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের মেয়র প্রার্থী অধ্যাপক আ স ম আব্দুল মালেক, অধ্যাপক মুন্সী আব্দুল বাসেদ, খেলাফত মজলিসের জেলা নেতৃবৃন্দ, এলডিপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোখলেছুর রহমান, এনসিপির সভাপতি প্রকৌশলী এস এম এ মাহমুদ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির সভাপতি মাহফুজুল হক, অধ্যাপক রফিকুল আলম, অ্যাডভোকেট আল আমীন, অ্যাডভোকেট শাহিন মিয়া, নূর মোহাম্মদ আবু তাহের এবং অধ্যক্ষ ইকবাল হোসেনসহ ১১ দলীয় জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।




