
চারদিকে পানি, বালু আর বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। বর্ষায় নদীর পানি বাড়লে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যোগাযোগব্যবস্থা। তখন নৌকাই হয়ে ওঠে চরবাসীর একমাত্র ভরসা। শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার—সবকিছুর জন্যই প্রায় ৮ কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিতে হয়। এভাবেই নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের গতিয়াশাম মাঝের চর, খিতাবখার চরসহ আশপাশের এলাকার মানুষ।
চরের ছেলেমেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য দুটি বিদ্যালয় থাকলেও মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়তে হলে তাদের পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ পথ। মাঝের চর থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যেতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। এর মধ্যে নদীপথে নৌকায় যেতে হয় প্রায় ৮ কিলোমিটার এবং সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। বর্ষাকালে নদীর পানি বেড়ে গেলে যাতায়াতের ঝুঁকি আরও বাড়ে। এতে কয়েকশ মানুষের দৈনন্দিন চলাচল দুর্ভোগে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন জানান, চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কেউ চরঢুসমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বগুড়া পাড়া সরকারি বিদ্যালয়, সরকারবাড়ি মাধ্যমিক স্কুল কিংবা সরিষাবাড়ি আলিম মাদরাসায় পড়াশোনা করছে।
তবে যাতায়াতের দুর্ভোগের কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। বিশেষ করে বর্ষাকালে নৌকা না পাওয়া, নদীর স্রোত ও ঘাটের সমস্যার কারণে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
চর গতিয়াশামের শিক্ষার্থী সুমাইয়া জানায়, প্রতিদিন তাকে নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বাড়ি থেকে বের হলেও নৌকা পেতে প্রায় ৯টা বেজে যায়। এরপর নদী পার হয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে ১০টা বেজে যায়। ফলে পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিদিনের যাতায়াতও তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুমাইয়ার দাবি, “এখানে একটি হাইস্কুল হলে আমাদের অনেক সুবিধা হতো। তবে তার আগে নদী খনন করা দরকার। তাহলে বাড়িঘর ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাবে।”
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোছা. আর্জিনা খাতুন বলেন, “আমাদের বাড়ি থেকে স্কুলে আসতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। মাঝে মাঝে নৌকা থাকে না। ফলে সেদিন আর স্কুলে আসা হয় না। চরে পড়াশোনার সুবিধা না থাকায় অল্প বয়সে আমাদের মা-বাবা বিয়ে দিয়ে দেন। জীবনের স্বপ্ন থাকলেও সেটি পূরণ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।”
শিক্ষার পাশাপাশি চিকিৎসাক্ষেত্রেও বঞ্চিত চরাঞ্চলের মানুষ। সেখানে নেই হাসপাতাল, নেই ডাক্তার। অসুস্থ হলে সুচিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। চিকিৎসার জন্য কয়েক কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিতে হয়, তখন নৌকাই তাদের একমাত্র ভরসা। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে নানা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ফলে সবসময় উৎকণ্ঠায় থাকতে হয় চরাঞ্চলের মানুষকে।
সরেজমিনে জানা যায়, চরাঞ্চলের মোট জনসংখ্যা আনুমানিক দেড় থেকে দুই হাজার। এর মধ্যে স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ৬০০ জন। এসব বাসিন্দাকে দৈনিক যাতায়াতের জন্য জনপ্রতি প্রায় ৬০ থেকে ৮০ টাকা নৌকা ভাড়া দিতে হয়।
মাঝের চরের বাসিন্দা আবু তাহের জানান, প্রতিদিন প্রায় ৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে গঞ্জে আসতে হয়। খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হাতের নাগালে না থাকায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। ফলে একসঙ্গে কয়েক দিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নিয়ে যেতে হয়। কারণ প্রয়োজন হলেই সবকিছু হাতের কাছে পাওয়া যায় না।
এ বিষয়ে চর গতিয়াশামের সাবেক ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম জানান, মাঝের চরের মানুষের বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা হয়। বন্যার সময় ত্রাণ, বস্ত্র, বিশুদ্ধ পানি, টিউবওয়েল, কোরবানির মাংসসহ বিভিন্ন সহযোগিতা দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যে উদ্যোগ গ্রহণ করছে, সেটি বাস্তবায়িত হলে চরের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা অনেকটাই কমবে বলে আশা করা যায়।




