
পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি (নেছারাবাদ) উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বড় নার্সারি অঞ্চল। ফল, ফুল, ঔষধি ও বনজ গাছের চারা উৎপাদনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এ শিল্প এখন স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ফুল ও ফুলের চারার বাণিজ্যিক চাষ দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। এ খাতের আরও প্রসারের জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণের দাবি জানিয়েছেন নার্সারি মালিক ও ব্যবসায়ীরা।
উপজেলার আকলম, অলংকারকাঠি, সুলতানপুর, সংগীতকাঠি, আরামকাঠিসহ ২০-২৫টি গ্রামের প্রায় ৫০০ হেক্টর জমিতে নার্সারি গড়ে উঠেছে। এসব এলাকায় দুই হাজারের বেশি নার্সারি রয়েছে। বছরের শুরু থেকেই নার্সারিগুলোতে কর্মব্যস্ততা শুরু হয়। বর্ষা মৌসুমে চারা উৎপাদন ও কেনাবেচা বেড়ে যাওয়ায় ব্যস্ততা আরও বাড়ে। প্রায় ৬০ বছর আগে স্বরূপকাঠিতে বনজ, ফলদ ও ঔষধি গাছের চারা-কলম উৎপাদন ও বাণিজ্যিকভাবে কেনাবেচার মাধ্যমে এ শিল্পের বিস্তার শুরু হয়। শুরুতে চারা ও কলম উৎপাদনই ছিল প্রধান কার্যক্রম। পরবর্তী সময়ে ফুল ও ফুলের চারার চাহিদা বাড়তে থাকায় নার্সারি মালিকেরা এ খাতে মনোযোগ দেন। গত সাত-আট বছর ধরে উপজেলার বিভিন্ন নার্সারিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ ও ফুলের চারা উৎপাদন হচ্ছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন নার্সারি ঘুরে দেখা যায়, সারি সারি হলুদ, লাল, কমলা ও সাদা রঙের নানা প্রজাতির ফুলে পুরো এলাকা যেন রঙিন হয়ে উঠেছে। মাঠের পর মাঠ এবং ক্ষেতের পর ক্ষেতজুড়ে ফুটে থাকা ফুলের সমাহার দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করছে। আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকেও অনেকে এসব নার্সারি দেখতে আসেন। দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে কোনো কোনো নার্সারিতে প্রবেশ, ছবি তোলা ও ফুল ছেঁড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও প্রতিদিন অনেক ফুল ও চারা দর্শনার্থীদের কারণে নষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয় সমাজসেবক মহিবুল্লাহ হাওলাদার বলেন, সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এ নার্সারি এলাকাটি একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হতে পারে। স্বরূপকাঠির নার্সারিগুলোতে ডালিয়া, কসমস, সালভিয়া, স্টার, জিনিয়া, সূর্যমুখী, ক্যাপসিক্যাম, ক্যাবিস্ট, গ্যাজানিয়া, ক্যারোনডোনা, স্যালোসিয়া, রজনীগন্ধা, গ্যালোডিয়া, নয়নতারা, চন্দ্রমল্লিকা, ইনকা গাঁদা, স্নোবল ও গোলাপসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফুল চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা ও গোলাপের চাহিদা বেশি। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও জাতীয় দিবসকে কেন্দ্র করে ফুলের চাহিদা আরও বেড়ে যায়।
এ অঞ্চলের নার্সারিগুলোতে শুধু ফুল নয়, বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারাও উৎপাদন করা হয়। কলমের মাধ্যমে তৈরি চারা ছাড়াও বিদেশি ফলের গাছের চারা পাওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এসব চারা বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও রাজধানীসহ দেশের নানা প্রান্তে সরবরাহ করা হয়। নার্সারি মালিক ও উদ্যোক্তাদের হিসাবে, একেকটি নার্সারিতে গড়ে ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক কাজ করেন। সব মিলিয়ে নার্সারি শিল্পে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। পাশাপাশি নার্সারিকে কেন্দ্র করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন। এ শিল্পের কারণে অনেকের বেকারত্ব দূর হয়েছে এবং বহু পরিবার আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছে।
অন্যদিকে ফুল ও ফুলের চারার চাষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় তিন হাজার শ্রমজীবী মানুষ যুক্ত রয়েছেন। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকার ও খুচরা বিক্রেতারা প্রতিদিন এসব নার্সারি থেকে বিভিন্ন জাতের ফুল ও চারা কিনে নিয়ে যান। পিকআপ ভ্যান, ট্রলার ও নৌকায় করে এসব ফুল ও চারা ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি, ফরিদপুর, বাগেরহাটসহ দেশের বিভিন্ন হাট-বাজারে সরবরাহ করা হয়।
পটুয়াখালীর বাউফলের ব্যবসায়ী এ টি এম তারেক বলেন, স্বরূপকাঠির নার্সারিগুলো দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। নিজের এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তুলছেন এবং এ জন্য ইতোমধ্যে স্বরূপকাঠির বিভিন্ন নার্সারি থেকে প্রায় ২১ হাজার চারা কিনেছেন। ২০০২ সালে জাতীয় পুরস্কার পাওয়া আদর্শ নার্সারির মালিক মো. আব্দুস সালাম হাওলাদার জানান, এসব নার্সারি থেকে প্রতি মাসে গড়ে আনুমানিক চার থেকে পাঁচ লাখ টাকার ফুল ও ফুলের চারা বিক্রি হয়। নার্সারি মালিকদের হিসাবে, চলতি মৌসুমে দুই থেকে তিন কোটি টাকার ফুল, ফুলের চারা ও অন্যান্য চারা বিক্রি হতে পারে।
ছারছীনা নার্সারির মালিক মো. জাহিদ হোসেন পলাশ জানান, বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকারি ক্রেতাদের পাশাপাশি খুচরা ক্রেতারাও ফুল ও চারা কিনতে আসেন। বর্তমানে তার নার্সারিতে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ প্রজাতির ফুলের চারা চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা ও গোলাপের চাহিদা বেশি। ২০১৪ সালে নার্সারি বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পাওয়া নেছারাবাদ নার্সারির মালিক মো. মানিক হোসেন জানান, ফুল চাষের জন্য যশোর ও বগুড়া থেকে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের বীজ ও চারা আনা হয়।
নার্সারি ব্যবসায়ীরা জানান, এ ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি জোগাড় করতে তাদের অনেক সময় বিভিন্ন এনজিও থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হয়। ফুল ও ফুলের চারার চাষ আরও সম্প্রসারণ এবং নার্সারি শিল্পকে এগিয়ে নিতে তারা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি সুদমুক্ত ব্যাংক ঋণের দাবি জানিয়েছেন।
নার্সারি শিল্পের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ চারাগাছের বেচাকেনা হয়। উদ্যোক্তাদের হিসাবে, বিভিন্ন নার্সারি থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার চারাগাছও বিক্রি হয়। বর্ষা মৌসুমে চারা কেনাবেচা সবচেয়ে বেশি হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, ফুল চাষে তেমন কোনো আর্থিক সহায়তা দেওয়া না হলেও প্রযুক্তিগত পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। নার্সারি খাতকে আরও এগিয়ে নিতে নিয়মিত নার্সারি পরিদর্শনের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। ফুল ও ফুলের চারা উৎপাদনের পাশাপাশি ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা উৎপাদনের কারণে স্বরূপকাঠির নার্সারি শিল্প এখন স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত হিসেবে গড়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের এই নার্সারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তা, শ্রমিক, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাদের কার্যক্রমে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।




