
বগুড়া জেলার সার্বিক উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জনে মাদকের বিস্তার রোধ, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে সমন্বিত সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আজ বুধবার সকাল ১১টায় জেলা প্রশাসকের ‘করতোয়া’ সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন সমন্বয় সংক্রান্ত মতবিনিময় সভা’য় এসব কথা বলেন বক্তারা।
বগুড়ার জেলা প্রশাসক মোঃ তৌফিকুর রহমান-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসন ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মোঃ আব্দুল বারী, এমপি।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বগুড়া-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা।
এছাড়া আরও বক্তব্য রাখেন ও উপস্থিত ছিলেন বগুড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র অ্যাডভোকেট এ.কে.এম মাহবুবর রহমান, বগুড়ার বিজ্ঞ জেলা জিপি ও পিপি অ্যাডভোকেট মোঃ আব্দুল বাছেদ, বগুড়া জেলা পরিষদের প্রশাসক আহসানুল তৈয়ব জাকির, সদর থানা বিএনপির সভাপতি মাফতুন আহমেদ খান রুবেল, শহর জামায়াতের আমীর আব্দুল হক সরকার, বগুড়ার পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ (পিপিএম), এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বগুড়ার উপ-পরিচালক মোঃ জিল্লুর রহমানসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রধানগণ।
আইনশৃঙ্খলা, মামলা জট ও বিচার বিভাগীয় আলোচনা: মতবিনিময় সভায় জেলার আদালত ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়। সভায় পিপি অ্যাডভোকেট আব্দুল বাছেদ জানান, বগুড়ায় বর্তমানে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মিলে প্রায় ৪৮ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
এর মধ্যে সেশন কোর্টে ১৫,১০১টি এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের অধীনে ৩২,২৯৮টি মামলা রয়েছে। তিনি আরও জানান, জেলায় ১৩ হাজারের বেশি মাদকের মামলা রয়েছে, যার মধ্যে ৫ বছর পর্যন্ত শাস্তির সাড়ে ৯ হাজার মামলা সিজেএম কোর্টে এবং নতুন গঠিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ট্রাইব্যুনালে প্রায় ৪,১০০টি মামলা বিচারাধীন। বিশাল এই মামলা জট নিরসনে বগুড়ায় কমপক্ষে ৩টি পৃথক মাদক ট্রাইব্যুনাল গঠনের জোর দাবি জানান তিনি।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিচার ব্যবস্থার গতি বাড়ানো এবং বিকল্প উপায়ে মামলা নিষ্পত্তির বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন অন্যান্য অতিথিবৃন্দ। তারা উল্লেখ করেন, শুধুমাত্র জনবল বা ট্রাইব্যুনাল বাড়ানোই মূল সমাধান নয়; বরং যেসব মামলায় বাদী-বিবাদী আপস হয়ে গেছে বা বাদী পরপর একাধিক তারিখে উপস্থিত হচ্ছেন না, সে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণে খারিজ (Dismiss) করে আদালতের জট কমানো সম্ভব।
মাদক, গুরুতর অপরাধ ও ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট: সভায় বক্তারা স্পষ্ট করেন যে, ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর ধারাগুলোর সঠিক প্রয়োগ ঘটাতে হবে। যেসকল মামলায় মৃত্যুদণ্ড বা সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তার মধ্য থেকে চিহ্নিত ৩০-৫০টি গুরুত্বপূর্ণ মামলা দ্রুত ট্রায়ালে এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ২০০১-২০০২ সালে অ্যাসিড সন্ত্রাস রোধে কঠোর বিচার ও 'ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট' কার্যকর করার ফলে যেভাবে অপরাধ দমিত হয়েছিল, একইভাবে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধেও দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করলে সমাজে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ে চাঞ্চল্যকর ও সংবদ্ধ সন্ত্রাসী চক্রের প্রায় ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি, পুলিশ প্রশাসনের মনিটরিংয়ে সময়মতো সাক্ষী হাজির করা এবং আদালত চত্বরে সুশৃঙ্খল বিচারিক পরিবেশ বজায় রাখার ওপর সভায় সন্তোষ প্রকাশ করা হয়।
অনলাইন জুয়া ও নতুন সামাজিক ব্যাধি: সভায় সাম্প্রতিক সময়ে তরুণ ও যুবসমাজের মাঝে ছড়িয়ে পড়া মোবাইলনির্ভর অনলাইন জুয়ার ভয়াবহতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বক্তারা বলেন, মাদকের পাশাপাশি অনলাইনে অবৈধ জুয়া সামাজিক ও পারিবারিক শান্তি বিনষ্ট করছে এবং অপরাধ প্রবণতা বাড়াচ্ছি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনলাইন জুয়ার চক্র ও এর পেছনের চালিকাশক্তিকে দ্রুত চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সমাপনী বক্তব্যে প্রধান অতিথি ও অতিথিবৃন্দ বগুড়াকে একটি নিরাপদ, মাদক মুক্ত ও উন্নত জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসন, বিচার বিভাগ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সুশীল সমাজকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।




