
পটুয়াখালীঃপ্রকৃতি যেন রূপের পসরা সাজিয়ে বসেছে সাগরকন্যা কুয়াকাটায়। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সাগরের নীল জলরাশি, বিস্তীর্ণ বালুচর আর দিগন্তজোড়া আকাশের মিতালিতে তৈরি হয়েছে কোনো রূপকথার ক্যানভাস। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন এখানে ভিড় জমান দেশের নানা প্রান্তের ভ্রমণপিপাসুরা।
তবে বর্তমানে কুয়াকাটার চিরচেনা এই সৌন্দর্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন এক মাত্রা—সাদা ঝিনুকের অপূর্ব সমারোহ। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, পুরো সৈকতজুড়ে কেউ যেন সাদা রঙের কোনো গালিচা বিছিয়ে রেখেছে।
ভোরের আলো ফুটতেই যখন জোয়ারের পানি নেমে যায়, তখনই কুয়াকাটার বিভিন্ন অংশে ভেসে ওঠে ঝিনুকের এই রাজ্য। বিশেষ করে তিন নদীর মোহনা, গঙ্গামতী, লেম্বুরচর ও দোলনা পয়েন্টসহ সৈকতের বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় অসংখ্য ঝিনুক ছড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। কোথাও সারি সারি ঝিনুক, আবার কোথাও অগভীর পানির সঙ্গে মিশে থাকা সাদা খোলস—সব মিলিয়ে পুরো সৈকতজুড়ে তৈরি হয়েছে এক মোহনীয় দৃশ্য।
স্থানীয় জেলে ও কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের বাসিন্দাদের মতে, প্রাকৃতিকভাবে প্রতিবছরই কোনো না কোনো সময়ে সৈকতে ঝিনুকের খোলস দেখা যায়। তবে সব বছর সমান পরিমাণে তা দেখা যায় না। সমুদ্রের ঢেউ, জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ, স্রোত এবং উপকূলের প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ওপর এর উপস্থিতি কম-বেশি নির্ভর করে। স্থানীয়দের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্ষা শেষে সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে শীত মৌসুমের শুরু পর্যন্ত কুয়াকাটার সৈকতগুলোতে ঝিনুকের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়। তবে নির্দিষ্ট কোনো সময়ে বা সমপরিমাণ ঝিনুক পাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট নিশ্চয়তা থাকে না।
লেম্বুরবন বিটের কর্মকর্তা আমির হামজা বলেন, “সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শীত মৌসুম পর্যন্ত সৈকতে ঝিনুক তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এসব ঝিনুক ও মোহনার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটকদের সচেতন হওয়া জরুরি।” তিনি আরও জানান, ঝিনুক সৈকতে এসে একটানা একই স্থানে পড়ে থাকে না; জোয়ার-ভাটার পরিবর্তনের সঙ্গে এগুলোর অবস্থান বদলে যায়।
সৈকতে ঝিনুক দেখে অনেক পর্যটকেরই এগুলো সংগ্রহ করে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়। এ বিষয়ে স্থানীয় লোকজন ও পরিবেশবাদীদের জোরালো আহ্বান—ঝিনুক দেখুন, ছবি তুলুন এবং এর সৌন্দর্য উপভোগ করুন; কিন্তু কেউ যেন এগুলো কুড়িয়ে সঙ্গে করে নিয়ে না যান।
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন কুয়াকাটার (উপরা) আহ্বায়ক জানান, “কুয়াকাটার সৈকতে ঝিনুকের এই প্রাকৃতিক সমারোহ উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এসব ঝিনুক সৈকতে এসে জমা হয়, যা পর্যটকদের জন্য নান্দনিক সৌন্দর্যের নতুন মাত্রা যোগ করেছে।”
ওয়ার্ল্ডফিশের সহযোগিতায় বাস্তবায়িত ‘সুস্থ সাগর’ প্রকল্পের গবেষণা সহকারী জানান, সৈকতে পড়ে থাকা এসব খোলস মূলত সমুদ্রে বসবাসকারী ঝিনুক ও অন্যান্য মোলাস্কের অবশিষ্টাংশ। ঝিনুক মারা যাওয়ার পর এর খোলস সমুদ্রের তলদেশে পড়ে থাকে। পরবর্তীতে ঢেউ, জোয়ার-ভাটা ও সমুদ্রস্রোতের টানে সেগুলো ধীরে ধীরে উপকূলের দিকে ভেসে আসে এবং ভাটার সময় বালুচরে আটকে যায়।
ঢাকা শের ই বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়,সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক, ফিসারিজ এন্ড মেরিন সাইন্স অনুষদ, মীর মোহাম্মদ আলী বলেন- কুয়াকাটা সৈকতে হঠাৎকরে এতপরিমান ঝিুনুক ভেসে আসাকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য হিসেবে না দেখে এর কারণ খুঁজে বের করতে হবে। সমুদ্রের কোথাও তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া কিংবা অতিরিক্ত বিষাক্ত শৈবালের কারণে এটি ঘটেছে কিনা- এসব গবেষণার বিষয়।'



