
রংপুরে বিভিন্ন স্থানে মাটি বাহিত রোগ অ্যানথ্রাক্স (তড়কা) ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় সতর্কবস্থা গ্রহণ করেছে প্রাণিসম্পদ ও স্বাস্থ্য বিভাগ। এজন্য জেলার প্রতিটি উপজেলায় বিভিন্ন পেশার মানুষদের নিয়ে সচেতনতা মূলক বৈঠক করেছেন। এর সাথে জোড়দার ভাবে চলছে গবাদিপশু ভ্যাকসিন কার্যক্রম।
প্রাণিসম্পদ ও স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি (সেপ্টেম্বর)মাসের ২ তারিখে রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ছাওল ইউনিয়নের আদম পাড়া এলাকায় সেনা সদস্য সুমন মিয়া সহ (২৯) তার পরিবারের মোট ৩ জনের অ্যানথ্রাক্স রোগ হতে পারে এমন সন্দেহ দেখা দেয়।
বিষয়টি আমলে নিয়ে পীরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সৈয়দ মাহমুদুর রহমান সেখানকার ১১ জনের নমুনা সংগ্রহ করে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মাধ্যমে ঢাকায় রোগতত্ত্ব বিভাগে পাঠানো হয়। সেখানে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় তাদের ৩ জনের দেহে অ্যানথ্রাক্স জীবাণু পাওয়া যায়। এ ঘটনায় রোগতত্ত্ব বিভাগের ৬ সদস্যদের একটি দল ঘটনাস্থলে এসে সেখানকার মাটি সহ অন্যান্য আলামত সংগ্রহ করে নিয় যান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আক্রান্তের আত্মীয় একটি গরু (দামড়ি) বাইরের উপজেলা থেকে প্রায় ৪ মাস আগে ক্রয় করেন। হঠাৎ করে অসুস্থ হলে ২সেপ্টেম্বর জবাই করে ভাগবাটোয়ারা করে নেন। গরুর মাংস নাড়াচাড়া করায় হাতে কালো দাগ হওয়া সহ ওই দিনই তাদের দেহে অ্যানথ্রাক্স এর লক্ষণ দেখা দেয়। বিষয়টি স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের দৃষ্টিগোচর হলে তারা দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
রংপুর জেলার দায়িত্ব প্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডাঃ ফিরোজ হাসান খান জানান,অ্যানথ্রাক্স রোগ মূলত অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গরুর থেকে সংস্পর্শে আসা মানুষের দেহে ছড়িয়ে পড়ে। তবে বর্তমানে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে অ্যানথ্রাক্স পজেটিভ পাওয়া যায়নি।
চলতি মাসে প্রথম দিকে সন্দভাজন ১১জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৩ জন অ্যানথ্রাক্স পজেটিভ পাওয়া গেছে। এদের প্রত্যেকের বাড়ি পীরগাছা উপজেলার ছাউলা ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে। তাৎক্ষণিক চিকিৎসায় অ্যানথ্রাক্স আক্রান্তরা সুস্থ রয়েছে। তিনি আরো জানান, অ্যানথ্রাক্স সচেতনতায় প্রাণি বিভাগের সাথে সমন্বয় করা হচ্ছে।
গত বছর অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গরুর সংস্পর্শে এসে রংপুর জেলার পীরগাছা, কাউনিয়া এবং মিঠাপুকুর উপজেলায় অ্যানথ্রাক্স পজেটিভ হয়েছিল ৮৫ জন মানুষ। এবং এদের মধ্যে দুজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে।
রংপুর সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ পলাশ কুমার রায় জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে ভেটেরিনারি সার্জন নেই। তাই অসুস্থ পশু সনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরো জানান, বর্তমানে আমাদের দুটি স্বীকৃত জবাই খানার মধ্যে একটি চালু আছে। কিন্তু এই জবাইখানার বাইরেও যত্রতত্র পশু জবাই হওয়ায় আমাদের একজন পরিদর্শকের পক্ষে সব দেখা সম্ভব হচ্ছে না। এ জন্য তিনি স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে সমন্বয় করে কাজ করা শুরু করেছেন।
রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মোহাঃ নাজমুল হুদা জানান, অ্যানথ্রাক্স হচ্ছে মাটিবাহিত রোগ। যে স্থানে এটি দেখা যায় সেটি মূলত প্রায় ৬০ বছর স্থায়ী হয়।
তিনি স্বীকার করেন চলতি মাসের শুরুতে মানুষের সন্দেহজনক অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত হওয়ার খবরে পীরগাছা উপজেলায় চাওলা ইউনিয়নে জবাইকৃত গরুর মাংস পরীক্ষায় অ্যানথ্রাক্স পজেটিভ পাওয়া গেছে। তবে এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক গরু পাওয়া না যাওয়ায় পরীক্ষা করা হয়নি। তিনি আরো জানান, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে ভ্যাকসিনের ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
চলতি বছর ৩ লাখ ২০ হাজার পশুকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও জুলাই ও সেপ্টেম্বর এই দুই মাসে শতকরা ৫০ ভাগ অর্থ্যাৎ ২ লাখ ৩৭ হাজার পশুকে ভ্যাকসিন প্রদান করা হয়েছে।
এ ছাড়াও চলতি বছরে বাড়তি আরো ৩ লাখ পশুকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনার টার্গেট দেয়া হয়েছে । এছাড়াও পীরগাছা সহ জেলার বিভিন্ন স্থানে মানুষের মাঝে অ্যানথ্রাক্স সচেতনায় খামারীদের মাঝে আলোচনা সহ সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪টি উপজেলার ৩১ জন খামারির সন্দেহজনক ৫০টি অসুস্থ গরুর পরীক্ষা করে ১টি অ্যানথ্রাক্স পজেটিভ পাওয়া গেছে। গত ৩ মাসে (জুলাই -সেপ্টম্বর) জেলায় ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৫০টি গরু জবাই হয়েছে।
চলতি সেপ্টেম্বর মাসে আজ পর্যন্ত ৫১ হাজার ৪৩৬টি গরু জবাই হয়েছে। এদিকে অধিক লাভের আশায় রংপুর বিভাগীয় নগরীতে প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে গরুর মাংস। এর অধিকাংশ মাংস কসাইরা অল্প টাকায় বিভিন্ন উপজেলা থেকে সংগ্রহ করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাই বিশিষ্ট জনদের দাবি প্রশাসন থেকে কঠোর নজরদারি বৃদ্ধি করা হোক। যাতে অসাধু কসাইরা অসুস্থ পশুর মাংস সহজে বিক্রি করতে না পারে।




