
আদালতে দেওয়া তিন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে এসেছে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে অপ্রতিমকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, তার আইফোন নেওয়া এবং হামলার ধারাবাহিক বিবরণ। জবানবন্দিগুলোতে হত্যার মূল ঘটনাপ্রবাহে বেশ কিছু মিল রয়েছে। তবে হত্যার পর কে কোথায় যায় এবং কার ভূমিকা কী ছিল— এসব বিষয়ে বর্ণনায় পার্থক্যও রয়েছে।
জবানবন্দি অনুযায়ী, ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ আগে অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরে ছবি তোলার কথা বলে তাকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে প্রথমে তার আইফোন নেওয়া হয়। ফোন ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে কোদালের হাতল দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়। পরে তাকে হত্যা করা হয়।
আগেই করা হয় হত্যার পরিকল্পনা
তিন জবানবন্দির মধ্যে হত্যার পরিকল্পনার বিষয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন তুহিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ-ছয় মাস ধরে অপ্রতিমের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। এক বন্ধুর মোটরসাইকেলে করে ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও তৈরির জন্য অপ্রতিম তাদের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় যেত।
তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তার এবং অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত এক কিশোরের লোভ হয়। ঘটনার আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে তাদের দেখা হয়। সেখানেই আইফোন নেওয়া এবং অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন তুহিন।
অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরের জবানবন্দিতেও আগের শুক্রবারের বৈঠকের কথা এসেছে। তবে সে হত্যার পরিকল্পনার মূল দায় তুহিনের ওপর দিয়েছে।
তৃতীয় কিশোরের জবানবন্দিতেও বলা হয়েছে, ঘটনার দিন তাকে জানানো হয়— তুহিনের সঙ্গে মিলে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হবে।
অর্থাৎ, তিন জবানবন্দির তথ্য অনুযায়ী, হত্যার সিদ্ধান্ত ঘটনাস্থলে আকস্মিকভাবে নেওয়া হয়নি; আগেই অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
টিকটক থেকে যোগাযোগ, ছবি তোলার কথা বলে দেখা
তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, হত্যার আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ময়নামতির একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। সেখান থেকে অপ্রতিম তাকে নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা দেয়। ওই রাতেই টিকটকে অপ্রতিমকে মেসেজ করেন তুহিন। পরে অপ্রতিম একটি মোবাইল ফোন নম্বর দিলে সেখানে কথা হয়। পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হয়।
তুহিনের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিম তার বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরকেও একই সময়ে আসতে বলেছিল। উদ্দেশ্য ছিল ছবি তোলা। ছবি তোলার এই পরিচিত সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে বলে তিন আসামির জবানবন্দি থেকে জানা যায়।
প্রথমে নেওয়া হয় অপ্রতিমের আইফোন
হত্যাকাণ্ডের আগে অপ্রতিমের আইফোন নেওয়ার বিষয়ে তিন আসামির বক্তব্যে মিল রয়েছে।
অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরের ভাষ্য, সে অপ্রতিমের কাছে ফোন চাইলে অপ্রতিম সেটি দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর ফোনটি তুহিনের হাতে তুলে দেয় সে।
তুহিনের জবানবন্দিতেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়।
এরপর অপ্রতিম ফোনটি ফেরত চাইলে তুহিনের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। পুলিশের আগের বক্তব্যেও বলা হয়েছিল, অপ্রতিম আইফোনটি ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করলে তুহিন বাধা দেন। এরপরই মারধরের ঘটনা ঘটে।
প্রথম আঘাত করেন তুহিন
তিন আসামির জবানবন্দির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিল— অপ্রতিমকে প্রথম আঘাত করেন তুহিন।
তুহিনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে তিনি অপ্রতিমকে থাপ্পড় দেন। পরে পাশে থাকা একটি কোদালের হাতল দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন। এরপর অন্য দুজনকে অপ্রতিমকে মারতে বলেন।
অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরও জানিয়েছে, তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের ঝগড়ার একপর্যায়ে তুহিন কোদালের হাতল দিয়ে প্রথমে তার মাথায় আঘাত করেন। তৃতীয় কিশোরের জবানবন্দিতেও তুহিনের হাতে প্রথম আঘাতের কথা বলা হয়েছে।




