
“বাবা রে, দিনকাল তো আর আগের লাখান নাই! অহন গাঁও-গেরামে সব ইতা কারেন্ট আর মেশিনের কারবার। আমরার আমলে কালাইনজা হইতে না হইতে বেইট্যানতে ঢেঁকির পাড়ো গীত ধইরা ধান ভানতা। সেই চাউলের ভাত খাইলে গতর চাঙ্গা থাহতো, কলিজা জুড়াইতো। আর অহনকার জোয়ান্নাইনতা মেশিনের ফালিশ করা চকচকা কড়কড়া চাউল খায়। আমরার সেই ঢেঁকি তো অহন জ্যান্তই কব্বরে গেছে গা!”
বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন বানিয়াচং উপজেলার ঘাঘড়া কোণার এক প্রত্যন্ত গ্রামের ৭৬ বছর বয়সী প্রবীণ ঢেঁকি কারিগর মহরম আলী। তাঁর কথায় যেন ধরা পড়ে হারিয়ে যাওয়া এক গ্রামীণ জীবনের শেষ দৃশ্য। যে জীবনে ভোরের নীরবতা ভাঙত ঢেঁকির ‘পড়াত-পড়াত’ শব্দে, নতুন ধানের সুবাসে মুখর হতো উঠান, আর ঢেঁকিঘর হয়ে উঠত পল্লী নারীদের কাজ, গান, গল্প ও সামাজিকতার প্রাণকেন্দ্র।
একসময় গ্রামবাংলায় ঢেঁকি ছিল ধান ভানার অপরিহার্য যন্ত্র। নতুন ধান ঘরে উঠলেই বাড়িতে বাড়িতে পড়ে যেত ঢেঁকি চালানোর ধুম। কার্তিক-অগ্রহায়ণের সন্ধ্যা নামলেই কোনো না কোনো উঠান থেকে ভেসে আসত কাঠের ঢেঁকির ছন্দময় শব্দ। সেই শব্দ জানিয়ে দিত—কোনো ঘরে নতুন ধান উঠেছে, নবান্নের প্রস্তুতি চলছে।
প্রবাদে বলা হয়, ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে।’ কথাটির আক্ষরিক অর্থ যা-ই হোক, গ্রামীণ জীবনে ঢেঁকির অপরিহার্যতার প্রতিচ্ছবি এতে স্পষ্ট। শুধু ধান থেকে চাল নয়, চালের গুঁড়া, ডাল ও বিভিন্ন শস্য ভাঙার কাজেও ব্যবহৃত হতো ঢেঁকি। বিয়ের পিঠা, নবান্নের আয়োজন কিংবা শীতের পুলি-পায়েস—সবকিছুর প্রস্তুতিতেই ছিল এর সরব উপস্থিতি।
সাহিত্যে-লোকসংস্কৃতিতেও ঢেঁকির সেই উপস্থিতি ছিল প্রবল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘কমলাকান্ত’ চরিত্রের ভাবনায়ও উঠে এসেছে ঢেঁকির প্রয়োজনীয়তা। আবার জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসে বিয়েবাড়িতে ঢেঁকিতে ধান ভানার সঙ্গে নারীদের গান ও উৎসবের যে চিত্র পাওয়া যায়, তা গ্রামীণ জীবনে ঢেঁকির সামাজিক গুরুত্বেরই প্রতিচ্ছবি।
ঢেঁকিতে ধান ভানার কাজ ছিল কঠিন কায়িক শ্রমের। কিন্তু সেই শ্রমকেও আনন্দে পরিণত করার নিজস্ব সংস্কৃতি ছিল গ্রামে। দুই-তিনজন নারী পালা করে পাড় দিতেন, আরেকজন ধান নাড়াচাড়া করতেন। কেউ কুলায় চাল ঝাড়তেন, কেউ আবার গান ধরতেন। দীর্ঘ শ্রমের ক্লান্তি ভুলতে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ত গান, ছড়া, শ্লোক ও খনার বচন। সেই সঙ্গে চলত সংসারের সুখ-দুঃখ, বিয়ে, সন্তান, ফসল ও গ্রামের নানা খবরের আলোচনা।
প্রবীণ নারী বানেছা বিবি বলেন, “ঢেঁকিতে ধান ভানতে কষ্ট অইত, কিন্তু ওই কষ্টের মাঝেও আনন্দ আছিল। কয়েকজন একসাথে কাম করতাম, গান গাইতাম, গল্প করতাম। একজনের বাড়ির কাম শেষ অইলে আরেকজনের বাড়ি যাইতাম। অহন মেশিনে ধান ভাঙে, কাম তাড়াতাড়ি অইয়া যায়, কিন্তু ওই আগের মতো একসাথে বসা, কথা কওয়া, হাসাহাসি আর নাই।”
ঢেঁকির কাঠামোতেও ছিল লোকজ জ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতার সমন্বয়। লম্বা শক্ত কাঠের তৈরি মূল কাঠামোকে বলা হতো ‘ধড়’। এক প্রান্তে পা দিয়ে চাপ দিলে অন্য প্রান্তের মুষল ওপরে উঠত; পা ছেড়ে দিলে মুষল নিচে থাকা ধান বা শস্যে আঘাত করত। এই পাড়ের পুণরাবৃত্ত আঘাতেই ধানের খোসা ছাড়িয়ে তৈরি হতো চাল। কয়েকজন মিলে পালাক্রমে কাজ করায় শ্রমের চাপ কিছুটা কমত।
ঢেঁকি তৈরিও ছিল বিশেষ দক্ষতার কাজ। কাঠের ধরন, ধড়ের ভারসাম্য, মুষলের অবস্থান ও পাড় দেওয়ার সুবিধা—সবকিছু বুঝে তৈরি করতে হতো। একসময় গ্রামবাংলায় এ কাজ জানা কারিগর ছিলেন অনেক। এখন সেই কারিগরিও হারিয়ে যাচ্ছে।
প্রবীণ কারিগর মহরম আলী বলেন, “আগে ঢেঁকি বানাইতাম, মেরামত করতাম। একেক বাড়িতে ঢেঁকি থাকত। নতুন ধান উঠলেই কাজের ডাক পড়ত। অহন মানুষ ধান মিলে নেয়। ঢেঁকি বানাইতে কইলে কাঠের কাম জানে এমন মানুষও আর সহজে পাওয়া যায় না। আমরার পরের পোলাপান এই কাম শিখে নাই। এইভাবে এখন ঢেঁকি শুধু ছবিতেই থাকব।”
তিনি আরও বলেন, “ঢেঁকি হারাইলে শুধু একটা কাঠের জিনিস হারাইব না। এর লগে হারাইব একটা কাম, একটা বিদ্যা, একটা সময়। পোলাপানরে যদি এখন না দেখানো যায়, পরে তারা বইতে পড়ব—একসময় মানুষ পা দিয়া ধান ভানত।”
বানিয়াচংয়ের হাওড়পাড়ের গ্রামগুলোতে একসময় ঢেঁকিঘর ছিল নারীদের সামাজিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো বাড়িতে বিয়ের আয়োজন হলে, নতুন ধান উঠলে কিংবা শীতের পিঠা তৈরির প্রস্তুতি নিলে ঢেঁকিঘর সরব হয়ে উঠত। প্রান্তিক নারীরা অনেক সময় অন্যের বাড়িতে ধান ভেনে পারিশ্রমিক হিসেবে ধান বা টাকা পেতেন। অর্থাৎ ঢেঁকি ছিল একদিকে খাদ্য উৎপাদনের হাতিয়ার, অন্যদিকে গ্রামীণ নারীদের শ্রম এবং আয়েরও একটি মাধ্যম।
কিন্তু বিদ্যুৎচালিত ধান ভাঙার মেশিন আসার পর দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যায়। মেশিনে অল্প সময়ে বেশি ধান ভাঙা যায়, শ্রমও লাগে কম। ব্যস্ত জীবনে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই দ্রুত ও সহজ পদ্ধতির দিকে ঝুঁকেছে। ফলে বাড়ির উঠান থেকে সরে গেছে ঢেঁকি, হারিয়ে গেছে ঢেঁকিঘর। কোথাও পুরোনো ঢেঁকি পড়ে আছে ধুলোমাখা অবস্থায়, কোথাও উইপোকায় খেয়ে ফেলেছে কাঠ, কোথাও আবার তার অস্তিত্বই নেই।
এর সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে ঢেঁকি ছাঁটা চালও। মেশিনে পালিশ করা চকচকে সাদা চালের ভিড়ে ঢেঁকিছাঁটা চাল এখন অনেকটাই দুর্লভ। অথচ ঢেঁকিছাঁটা চালে ধানের কুঁড়া ও পুষ্টিকর স্তর তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।
ঢেঁকিছাটা চালের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে বানিয়াচং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচও) ডা. শামিমা আক্তার বলেন, ঢেঁকিছাঁটা চালে ভিটামিন বি১, বি৩, বি৬, খাদ্যআঁশ, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন ও জিংকসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকে। ধানের কুঁড়া ও পুষ্টিকর স্তর পুরোপুরি বাদ না যাওয়ায় সাধারণ সাদা চালের তুলনায় এতে খাদ্যআঁশ ও কিছু পুষ্টি উপাদান বেশি থাকে। পরিমিত পরিমাণে খেলে হজমশক্তি ভালো রাখা, দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখা এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে এটি হৃদ্স্বাস্থ্য ও ওজন নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে ঢেঁকির বিলুপ্তি শুধু একটি কৃষিযন্ত্রের হারিয়ে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে হারাচ্ছে একটি খাদ্যসংস্কৃতি, নারীর শ্রমের ইতিহাস, লোকগান, ছড়া, পারিবারিক আড্ডা ও গ্রামীণ সামাজিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ঢেঁকি হারিয়ে গেলে হারিয়ে যায় সেই ‘পড়াত-পড়াত’ শব্দ; নিঃশব্দ হয়ে যায় ঢেঁকিঘরের গান।
একসময় বিয়েবাড়িতে পিঠা তৈরির জন্য চাল ভাঙা, নবান্নে নতুন চালের আয়োজন কিংবা শীতের সকালে চিতই-পুলি বানানোর জন্য চালের গুঁড়া করার কাজে ঢেঁকি ছিল অপরিহার্য। এখন সেই জায়গা নিয়েছে বৈদ্যুতিক গ্রাইন্ডার ও আধুনিক মেশিন। সময় বেঁচেছে, শ্রম কমেছে—কিন্তু হারিয়ে গেছে সেই কাজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সম্মিলিত আনন্দ।
এ কারণেই প্রবীণদের আক্ষেপ শুধু একটি কাঠের যন্ত্রের জন্য নয়; হারিয়ে যাওয়া একটি সময়ের জন্য। যে সময়ে পল্লী মায়েদের কণ্ঠে গান উঠত, ধানের গন্ধে উঠান ভরে যেত, আর ঢেঁকির পাড়ের ছন্দে মিলেমিশে থাকত গ্রামের মানুষের জীবন।
আজ বানিয়াচংয়ের কোনো পুরোনো বাড়ির উঠানে পড়ে থাকা একটি ঢেঁকি হয়তো আর ধান ভাঙে না। তার গায়ে জমেছে ধুলো, কাঠে ধরেছে পোকা। তবু সেটি যেন একটি জীবন্ত ইতিহাস। তার শরীরে লেগে আছে নবান্নের স্মৃতি, নারীর ঘাম, পিঠার গন্ধ, লোকগানের সুর আর অসংখ্য পরিবারের গল্প।
আধুনিকতার অগ্রযাত্রাকে থামানোর প্রশ্ন নেই। মেশিন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, উৎপাদন বাড়িয়েছে, সময় ও শ্রম বাঁচিয়েছে। কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঐতিহ্যের স্মৃতিটুকু সংরক্ষণ করা যায় কি না—প্রশ্নটি এখন সেখানেই।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতে, ঢেঁকিকে আবার প্রতিটি বাড়ির অপরিহার্য যন্ত্রে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে হারিয়ে যাওয়ার আগে ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি সংরক্ষণ করা জরুরি। স্থানীয় জাদুঘর, লোকজ মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঢেঁকি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা গেলে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে—তাদের পূর্বপুরুষেরা কীভাবে পা দিয়ে ধান ভেঙে চাল তৈরি করতেন, কীভাবে শ্রমকে গান আর গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে জীবনের উৎসবে পরিণত করতেন।
বানিয়াচংয়ের বাতাসে এখন আর আগের মতো ভেসে আসে না ‘পড়াত-পড়াত’ শব্দ। নতুন ধানের সুবাসে মুখর হয় না প্রতিটি উঠান। বউ-ঝিদের দলবেঁধে ধান ভানার দৃশ্যও এখন কেবল স্মৃতির অংশ।
মেশিনের একটানা শব্দে ঢেকে গেছে কাঠের ঢেঁকির ছন্দ।
তবু কোনো পুরোনো উঠানে পড়ে থাকা ধুলোমাখা ঢেঁকিটি যেন নীরবে বলে যায়—একসময় এই জনপদের রাত জাগত ধানের শব্দে। পল্লী মায়েদের কণ্ঠে উঠত গান। নতুন ধানের সুবাসে ভরে যেত উঠান। পাড়ের পর পাড়ে মিশে যেত হাসি, গল্প আর জীবনের সুখ-দুঃখ।
আজ ঢেঁকি নেই, ঢেঁকিঘর নেই, নেই সেই পাড়ের গান। আছে শুধু স্মৃতি।
‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে’—প্রবাদটি হয়তো এখনো টিকে আছে। কিন্তু বানিয়াচংয়ের মাটিতে সেই ঢেঁকিই যদি একদিন আর না থাকে, তবে প্রবাদটিও হয়তো নতুন প্রজন্মের কাছে কেবল বইয়ের পাতায় পড়ে থাকবে।
‘পড়াত-পড়াত’ শব্দ হয়তো আর ফিরবে না। কিন্তু সেই শব্দের স্মৃতি, সেই কারিগরি জ্ঞান আর সেই গ্রামীণ ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায়—এটাই এখন সময়ের দাবি।




