
চুয়াডাঙ্গার মাটিতে জন্ম নেয়া এমন একজন কৃতী সন্তানের নাম এন. এন. সাহা, যার সৃষ্টি আজও বহন করে বাংলাদেশ রাষ্ট্র। সরকারি দপ্তর, সচিবালয়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, আদালত, সরকারি সিলমোহর, বাংলাদেশ পাসপোর্টের প্রচ্ছদ এবং অসংখ্য প্রশাসনিক নথিতে প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হচ্ছে তাঁর নকশা করা রাষ্ট্রীয় মনোগ্রাম। অথচ স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও এই কৃতী মুক্তিযোদ্ধা, ও শিল্পী পাননি কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা জাতীয় সম্মাননা।
তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী এলেই নতুন করে উঠে আসে একই প্রশ্ন—যাঁর সৃষ্টি রাষ্ট্র প্রতিদিন ব্যবহার করছে, সেই মানুষটির অবদান কি রাষ্ট্র ভুলে গেছে?
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনের প্রধান উপদেষ্টা ডা. আসহাব উল হকের আহ্বানে এন. এন. সাহা মুজিবনগর সরকারের জন্য রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের একাধিক নকশা প্রস্তুত করেন। পরবর্তীতে নির্বাচিত নকশাটি ২ এপ্রিল সরবরাহ করা হয়। সেই নকশার ধারাবাহিকতাতেই স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক হিসেবে সরকারি মনোগ্রাম ব্যবহৃত হতে থাকে। ১০ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গায় অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা থাকলেও পাকিস্তানি বাহিনীর বিমান হামলার কারণে অনুষ্ঠানটি বৈদ্যনাথতলায় (বর্তমান মুজিবনগর) স্থানান্তরিত হয়।
রাষ্ট্রীয় এই মনোগ্রামের নকশায় রয়েছে—বৃত্তের ঠিক মাঝখানে হলুদ রঙের বাংলাদেশের মানচিত্র, বৃত্তের ওপরের অংশে “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ” এবং নিচের অংশে “সরকার” লেখা। বৃত্তের দুই পাশে দুটি করে মোট চারটি তারকা সংযোজিত রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের সব দাফতরিক কার্যক্রম, সরকারি সিলমোহর এবং বাংলাদেশ পাসপোর্টের প্রচ্ছদে এই মনোগ্রামটি ব্যবহৃত হচ্ছে, যা স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
শুধু মনোগ্রামের নকশাকারই নন, এন. এন. সাহা ছিলেন একজন ভাষাসৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট শিল্পী ও সমাজসেবক। স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদান এবং শিল্পসৃষ্টির মাধ্যমে রাষ্ট্রগঠনে তাঁর ভূমিকা আজও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু সেই ইতিহাস আজও যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি।
চুয়াডাঙ্গার মানুষের কাছে বিষয়টি শুধু একজন ব্যক্তির সম্মানের প্রশ্ন নয়; এটি জেলার গৌরবেরও প্রশ্ন। এই জেলার সন্তান হিসেবে এন. এন. সাহা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক নির্মাণ করেছেন। অথচ তাঁর নামে জাতীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মাননা নেই। যদিও স্থানীয়ভাবে তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি বহুবার উঠেছে এবং বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তাঁর অবদানের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে আবেদন জানিয়ে আসছেন, যেন তাঁর অবদান রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়িত হয়। তাঁদের দাবি, এটি কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহের বিষয় নয়; বরং ইতিহাসের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার অংশ। একজন শিল্পী, মুক্তিযোদ্ধা ও রাষ্ট্রগঠনের নেপথ্য কারিগর হিসেবে এন. এন. সাহার যথাযথ মূল্যায়ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানাতে সহায়ক হবে।
সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন, স্বাধীনতার এত বছর পরও কেন একজন রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের প্রণেতার অবদান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পাবে না? কেন তাঁর জীবন ও কর্ম জাতীয় পাঠ্যক্রম, জাদুঘর কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্মাননার আলোচনায় স্থান পাবে না?
২০০২ সালের ২ সেপ্টেম্বর চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে এন. এন. সাহা মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সহধর্মিণী বিমলা বালা সাহাও পরবর্তীতে পরলোকগমন করেন। তাঁদের চার পুত্রের মধ্যে মেজো পুত্র মনোজ কুমার সাহাও আর বেঁচে নেই। বর্তমানে পরিবারের সদস্যরা আর্থিক সংকটের মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অথচ যে মানুষের সৃষ্টি আজও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দাপ্তরিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তাঁর পরিবারই আজ অবহেলা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের দাবি, এন. এন. সাহার মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মাননা শুধু তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনই হবে না, বরং তাঁর পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়বদ্ধতারও বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে।
চুয়াডাঙ্গাবাসীর প্রত্যাশা, রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের প্রণেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জেলার গর্ব এন. এন. সাহার অবদান দ্রুত সরকারি উদ্যোগে যাচাই করে তাঁকে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করা হবে। একই সঙ্গে তাঁর পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে সরকার এগিয়ে আসবে—এমন প্রত্যাশাও স্থানীয় মানুষের। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একটি জাতি তার প্রকৃত কৃতীদের সম্মান জানাতে পারলেই ইতিহাসের প্রতি তার দায়বদ্ধতা পূর্ণতা পায়।




