
বাটেক্সপোর উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে তিনি এ আহ্বান জানান।
বিবৃতিতে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রদর্শনী ‘বাংলাদেশ অ্যাপারেল অ্যান্ড টেক্সটাইল এক্সপোজিশন’ (বাটেক্সপো)। পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ ১৯৮৯ সাল থেকে ঐতিহ্যবাহী এ প্রদর্শনীর আয়োজন করে আসছে। দীর্ঘ ১২ বছরের বিরতির পর আগামী ১৮ ও ১৯ নভেম্বর ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে দুই দিনব্যাপী বাটেক্সপো পুনরায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে—এতে আমরা আনন্দিত।
তিনি বলেন, বাটেক্সপোর প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক উদ্যোগ। ১৯৮৯ সালে বিদেশি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা এবং পোশাক রপ্তানি সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে যে আয়োজনের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা দেশের প্রধান রপ্তানি শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
তবে সম্প্রতি বাটেক্সপোর উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াতের এ নেতা।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বাটেক্সপো বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। দীর্ঘ এক যুগ পর এ আয়োজনের প্রত্যাবর্তন দেশের পোশাক শিল্প, উদ্যোক্তা, শ্রমিক ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। অতীতে বাটেক্সপোর উদ্বোধন ও সমাপনী অনুষ্ঠানে সরকার ও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বার্তা বহন করত। এর মাধ্যমে দেশের প্রধান রপ্তানি শিল্পের প্রশ্নে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা দেওয়া হতো।
তিনি আরও বলেন, এ ঐক্যের বার্তা ধারণ করেই আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর দীর্ঘদিনের একটি ঐতিহ্য হলো উদ্বোধনী দিনে প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান অতিথি এবং সমাপনী দিনে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতাকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো। বিজিএমইএর বর্তমান পরিচালনা পর্ষদও প্রথম বোর্ড সভায় এ ঐতিহ্য অনুসরণ করে উভয়কে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলে তারা জানতে পেরেছেন।
তবে পরবর্তীতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বিজিএমইএর বর্তমান সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সমাপনী অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতাকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন বলে দাবি করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাঁর মতে, এ সিদ্ধান্ত বিজিএমইএর অনেক পরিচালক ও সাধারণ সদস্যের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, বিজিএমইএর মতো জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বৃহৎ ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তা সংগঠনকে যেকোনো ধরনের সংকীর্ণ দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে রাখা জরুরি। দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্য অনুযায়ী সমাপনী অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতাকে আমন্ত্রণ না জানানোর সিদ্ধান্তে সংগঠনটির নিরপেক্ষতা ও ভারসাম্যের ব্যত্যয় ঘটতে পারে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা কোনো অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হওয়ার জন্য আগ্রহী বা লালায়িত নন। বিষয়টি কোনো ব্যক্তি বা পদকে কেন্দ্র করে নয়; বরং বিজিএমইএর দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা এবং দেশের ব্যবসায়ী সমাজের ঐক্য ও সংহতির প্রশ্ন।
তিনি আরও বলেন, বিজিএমইএর মতো জাতীয় পর্যায়ের একটি প্রতিষ্ঠিত সংগঠনকে রাজনৈতিক দলীয়করণের ঊর্ধ্বে রাখা সবার দায়িত্ব। এ ধরনের সিদ্ধান্ত সংগঠনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি ক্রেতা, বিনিয়োগকারী, কূটনীতিক ও অন্যান্য অংশীজনের কাছেও নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে।
তাঁর মতে, এতে বিজিএমইএর দীর্ঘদিনের ঐক্য, সংহতি ও পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজনের পরিবেশ তৈরি হলে তা দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্যও ইতিবাচক হবে না।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজার, উৎপাদন ব্যয়, শ্রমবাজারসহ নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যখন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প যাচ্ছে, তখন জাতীয় এ শিল্পখাতের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের অভ্যন্তরে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি হওয়া কাম্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ বিষয়ে বিজিএমইএর প্রতি আহ্বান জানিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এ ব্যবসায়ী সংগঠনকে সংকীর্ণ দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য বজায় রাখার স্বার্থে সমাপনী অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতাকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিজিএমইএর বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করবে এবং সংগঠনটির দীর্ঘদিনের ঐক্য, সংহতি, নিরপেক্ষতা ও ঐতিহ্য সমুন্নত রাখবে।
বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, জাতীয় শিল্পের প্রতিটি আন্তর্জাতিক আয়োজনে বাংলাদেশের ঐক্য, স্থিতিশীলতা, সক্ষমতা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ইতিবাচক বার্তা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন।
তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের স্বার্থে বিজিএমইএকে কোনো দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবের বাহন নয়, বরং দেশের সব পোশাক প্রস্তুতকারক, রপ্তানিকারক ও শিল্পোদ্যোক্তার ঐক্যবদ্ধ প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চান।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বাটেক্সপো শুধু একটি প্রদর্শনী নয়; এটি বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশকে বিশ্বে উপস্থাপনের একটি সুযোগ। বাটেক্সপো রাজনৈতিক বিভাজনের নয়, বরং বাংলাদেশের পোশাক শিল্প, জাতীয় ঐকমত্য ও দেশের ইতিবাচক ভাবমর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠবে—এটাই প্রত্যাশা।




