
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন নিয়ে একের পর এক ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই এসেছে ব্যর্থতা। ১৬টি ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাননি শামীম ইসলাম। পরিবারের আর্থিক অনটন, মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ১৭তম চেষ্টায় এসে অবশেষে পূরণ হয়েছে তার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন।
২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার ‘বি’ ইউনিটে উত্তীর্ণ হয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থানীয় সরকার ও নগর উন্নয়ন বিভাগে ভর্তি হয়েছেন শামীম ইসলাম।
তবে এই সাফল্যের পথ মোটেও সহজ ছিল না। ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। কিন্তু কোথাও সুযোগ পাননি। শেষ পর্যন্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয় তাকে।
একাধিকবার ব্যর্থ হওয়ার পরও নিজের স্বপ্ন থেকে সরে আসেননি শামীম। বরং প্রতিটি ব্যর্থতা তার মনে আরও জেদ তৈরি করে। পাশাপাশি পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদও তাকে তাড়িয়ে বেড়াত।
কাজের সন্ধানে একপর্যায়ে ঢাকায় আসেন শামীম। চাকরি না পেয়ে একটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু সেখানে তিন দিন কাজ করার পর তার কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করা হলে চাকরিটি ছেড়ে দেন। এরপর গাজীপুরে ফিরে আসেন। শুরু করেন দ্বিতীয়বারের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি।
গাজীপুরে ফিরে এবার নিজের ব্যর্থতার স্মৃতিকেই প্রেরণা বানান শামীম। আগের ভর্তি পরীক্ষাগুলোর এডমিট কার্ড ও টাকা জমা দেওয়ার রসিদগুলো পড়ার টেবিলের সামনে টাঙিয়ে রাখেন। প্রতিদিন সেগুলোর দিকে তাকিয়ে নতুন করে পড়াশোনায় বসতেন। প্রতিটি ব্যর্থতাই যেন তাকে মনে করিয়ে দিত—এবার তাকে সফল হতেই হবে।
দ্বিতীয়বারের প্রস্তুতিতে কোনো কোচিংয়ে ভর্তি হননি শামীম। এক সেট বই কিনে নিজেই শুরু করেন পড়াশোনা। নিজের খরচ চালাতে দিনে পাঁচটি টিউশনি করাতেন। টিউশনি করাতে গিয়ে যে বিষয়গুলো পড়াতেন, রাতে সেগুলোই আবার নিজের জন্য গভীরভাবে পড়তেন। দিনভর টিউশনি শেষে রাত নয়টা থেকে শুরু হতো তার নিজের মূল পড়াশোনা।
এই দীর্ঘ প্রস্তুতিতে ছোট বোন রিফার সহযোগিতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন শামীম। তার ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়ার পেছনে ছোট বোনের অবদান সবচেয়ে বেশি।
শামীম ইসলাম বলেন, “আমি পড়াশোনা শেষ করে প্রতিদিন ছোট বোনের কাছে রিভিশন দিতাম। নির্দিষ্ট সময় মেপে পরীক্ষা দিতাম। এতে পড়াশোনার পাশাপাশি সময় ব্যবস্থাপনার দক্ষতাও তৈরি হয়েছিল।”
ইংরেজিতে বরাবরই দুর্বল ছিলেন শামীম। কিন্তু সেই দুর্বলতাকেই পরে শক্তিতে পরিণত করেন। ইংরেজি পড়িয়ে টিউশনি করানোর মাধ্যমে যেমন নিজের খরচ চালিয়েছেন, তেমনি নিজের ইংরেজির দক্ষতাও বাড়িয়েছেন।
নতুনদের উদ্দেশে শামীমের পরামর্শ, কোনো অবস্থাতেই অহংকারকে মনে জায়গা দেওয়া যাবে না। তার মতে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই খারাপ নয়; প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য রয়েছে।
শামীম বলেন, “নিজের ব্যর্থতার কথা কখনো ভুলে যাবেন না। সেগুলো সবসময় চোখের সামনে রাখুন। আর কখনো হতাশ হবেন না। শেষ সুযোগটুকু পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান। মনের ভেতর এই জেদটুকু রাখুন—আপনাকে পারতেই হবে।”
১৬টি ব্যর্থতার পর ১৭তম চেষ্টায় শামীমের এই সাফল্য শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির গল্প নয়; এটি বারবার ব্যর্থ হয়েও স্বপ্নের পেছনে ছুটে যাওয়ার গল্প।




