
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) প্রশাসনের শীর্ষ তিন পদ—উপাচার্য ও দুই উপ-উপাচার্যের দায়িত্বে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের শিক্ষকরা দায়িত্ব পান। তবে সম্প্রতি বিএনপি সরকার গঠনের পর দুই উপ-উপাচার্যকে সরিয়ে বিএনপিপন্থি হিসেবে পরিচিত দুই শিক্ষককে পদায়ন করা হয়। একই সময়ে কোষাধ্যক্ষের পদে থাকা অধ্যাপক ড. মো. আবদুর রবকে সরিয়ে অধ্যাপক ড. মো. সোহেল রানাকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
একই রাজনৈতিক মতাদর্শের শিক্ষকদের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ার পর প্রশাসনে সমন্বয় ও ঐক্য বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, উপাচার্যের সঙ্গে দুই উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের সমন্বয়ের ঘাটতি থেকে প্রশাসনের ভেতরে পৃথক বলয় তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে উপাচার্যও প্রশাসনের বাইরে থাকা জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের শিক্ষকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে কাদা ছোড়াছুড়ি ও পারস্পরিক ট্যাগিং:
প্রশাসনের দুই পক্ষকে ঘিরে শিক্ষক, কর্মকর্তা, সাবেক ও বর্তমান ছাত্রদল নেতাকর্মী এবং ছাত্রদল-সমর্থিত সাবেক জাকসু নেতাদের একাংশ দলীয় ও প্রশাসনিক রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং ‘আওয়ামীপন্থি’ বা ‘জামায়াতপন্থি’ হিসেবে ট্যাগ দেওয়ার ঘটনায় জড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নিজস্ব আইডির পাশাপাশি বিভিন্ন বেনামি পেজ থেকেও দুই উপ-উপাচার্য—অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম ও অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নজরুল ইসলামকে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সুবিধাভোগী হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগও সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
অন্যদিকে, অপর পক্ষ থেকে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসানকে জামায়াতের ‘গোপন এজেন্ট’ ও ‘আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, উপাচার্যের ছত্রছায়ায় ক্যাম্পাসে জামায়াতপন্থি শিক্ষকরা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রভাব তৈরি হয়েছে। এসব দাবিরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারুফ মল্লিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং গত ৫ সেপ্টেম্বর এটিএন বাংলার একটি টকশোতে উপাচার্যকে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ইঙ্গিত দিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, “জাবি ভিসিকে নিয়ে কিছু বললেই জামায়াতের বট বাহিনী তার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।”
এর প্রতিবাদে ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের প্যাডে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। তবে পরে ফোরামের সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম জানান, তার সম্মতি ও অনুমোদন ছাড়াই ওই বিবৃতিতে তার স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বিবৃতিটিকে ফোরামের প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা না করার আহ্বান জানান। বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
নিয়োগ ও সিন্ডিকেট সদস্য পদ নিয়ে বিরোধ:
বিভিন্ন নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয়েও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি মনোনীত সিন্ডিকেট সদস্য পদ নিয়ে দুই পক্ষের অনুসারীদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখা যায়।
এক পক্ষ জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ জামাল উদ্দীনকে সমর্থন করে প্রচারণা চালায়। অপর পক্ষ অধ্যাপক ড. নাহরিন ইসলাম খানকে সিন্ডিকেটের রাষ্ট্রপতি মনোনীত সদস্য করার দাবি জানায়। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পাশাপাশি সাবেক ছাত্রনেতাদের নামে স্বাক্ষর জাল করে বিবৃতি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
সিন্ডিকেট সদস্য মনোনয়নের ক্ষেত্রে একাডেমিক যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আলোচনায় থাকা অধ্যাপক জামাল উদ্দীনের পিএইচডি ডিগ্রি না থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। একই সঙ্গে তাকে উপাচার্য-ঘনিষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করে তার মনোনয়নের পেছনে প্রশাসনিক সমর্থন থাকার অভিযোগও করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
এদিকে অধ্যাপক জামাল উদ্দীন ও তার গবেষণা-সহযোগী সহকারী অধ্যাপক শারমিন আক্তার শিমুর একটি গবেষণাপত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠনের কথা জানা গেছে। ওই গবেষণাপত্রে ৬২ শতাংশ পর্যন্ত এআই-নির্ভর লেখা শনাক্ত হওয়ার দাবি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে এআই শনাক্তকরণ সফটওয়্যারের ফলাফলকে সরাসরি গবেষণায় জালিয়াতির চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
এ ছাড়া নতুন শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও প্রশাসনের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতে ঐতিহ্য ভাঙার অভিযোগ:
দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক রেওয়াজ ভাঙাকে কেন্দ্র করেও প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ দূরত্বের বিষয়টি সামনে এসেছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান রাষ্ট্রপতি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বঙ্গভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের প্রেস রিলিজেও এ সাক্ষাতের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষক দাবি করেছেন, অতীতে আচার্য বা সরকারপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাতের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের অন্যান্য কর্মকর্তাদেরও সঙ্গে রাখার রীতি ছিল। তাদের অভিযোগ, এবার দুই উপ-উপাচার্যকে সঙ্গে না নেওয়ার ঘটনায় প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতার বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। তবে এটি কোনো বাধ্যতামূলক প্রশাসনিক নিয়ম কি না, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধান পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা না করেই ২০২৭ সালের এপ্রিল মাসে সমাবর্তনের তারিখ নির্ধারণের অভিযোগও উঠেছে উপাচার্যের বিরুদ্ধে। গ্রীষ্ম মৌসুমে সমাবর্তনের সময় নির্ধারণ নিয়েও প্রশাসনের ভেতরে প্রশ্ন রয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতার অভিযোগ:
শিক্ষকদের একাংশের অভিযোগ, উপাচার্য নিয়মিত অফিসে উপস্থিত থাকেন না; তিনি মূলত বিভিন্ন সভা ও বৈঠকে অংশ নেন। ফলে তার অধীনস্থ কিছু প্রশাসনিক কার্যক্রমে ধীরগতি তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, শীর্ষ পর্যায়ের এই গ্রুপিংয়ের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম বলেন, “মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও আচার্য মহোদয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং সমাবর্তনের তারিখ নির্ধারণে সমন্বয়হীনতার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া বেশ কিছু কাজেও সমন্বয়হীনতা ঘটছে। প্রশাসনে সমন্বয়হীনতার কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হুমকির মুখে পড়েছে।”
অভিযোগগুলোর বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসানের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।




