
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) আইন ও বিচার বিভাগের শিক্ষক শামশাদ বাশারের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রকাশ্যে নম্বর কেটে দেওয়ার হুমকি, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও একাডেমিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রতিকার এবং ওই শিক্ষককে ৫২তম ব্যাচের সব একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অপসারণের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর অভিযোগপত্র দিয়েছেন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর অভিযোগপত্রটি জমা দেন বিভাগটির ৫২তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। অভিযোগপত্রে শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেন, চলতি বছরের জুনে বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই শামশাদ বাশার অসদাচরণ ও স্বেচ্ছাচারী আচরণ করে আসছেন। প্রথম ক্লাসেই তিনি বিভিন্ন নিয়মকানুনের কথা বলে শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ও মানসিক সুস্থতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ওই শিক্ষক প্রায়ই ক্লাসে শিক্ষার্থীদের মেধা নিয়ে কটূক্তি করেন এবং বলেন, তারা ভালো ফলাফল করার যোগ্য নন। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ক্রিমিনোলজি ও পেনোলজি কোর্সের টিউটোরিয়াল পরীক্ষা শুরুর সময় তিনি বলেন, পরীক্ষা শেষে কোনো একজন শিক্ষার্থীও প্রশ্নপত্র জমা না দিলে পুরো ব্যাচের নম্বর কেটে নেওয়া হবে। পরে পরীক্ষা শেষে সাধারণ অভ্যন্তরীণ আলোচনা নিয়ে উত্তেজিত হয়ে পাঁচ নম্বরের পরীক্ষায় দুই নম্বর করে কেটে নেওয়ার হুমকি দেন বলেও অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীরা আরও জানান, একই দিন পরীক্ষা চলাকালে এক নারী শিক্ষার্থী অতিরিক্ত খাতা সেলাই করতে ভুলে যাওয়ায় ওই শিক্ষক তাঁর উত্তরপত্র জমা না নিয়ে বিভাগের সভাপতির কক্ষে চলে যান। পরে প্রায় ৩০ মিনিট ওই শিক্ষার্থীকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখার পর কক্ষে প্রবেশের অনুমতি দেন। সেখানে ওই শিক্ষার্থীর দ্বিতীয় বর্ষের ফলাফল ৩.৯৩ জানার পর শিক্ষক কটূক্তি করে বলেন, তিনি এই ফলাফলের যোগ্য নন।
এতে ওই শিক্ষার্থী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগে শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, ওই শিক্ষক নিজে নিয়মিত ক্লাসে দেরিতে এলেও শিক্ষার্থীদের দুই-তিন মিনিট দেরি হলে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতে দেন না। কখনো কখনো শিডিউল দিয়ে শিক্ষার্থীদের দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত বসিয়ে রেখে ক্লাস বাতিল করেন। শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে অতিথি শিক্ষক থাকাকালীন সময়েও তাঁর বিরুদ্ধে নিয়মিত ও মানসম্মত ক্লাস না নেওয়ার অভিযোগ ছিল বলে দাবি করেন তারা। বর্তমান ক্লাসের আলোচনা ও বক্তব্যের সঙ্গে পাঠ্যসূচিরও সামঞ্জস্য থাকে না বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
এ অবস্থায় শিক্ষার্থীরা ওই শিক্ষকের প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ এবং ৫২তম ব্যাচের ক্লাস, পরীক্ষা ও ভাইভাসহ সব একাডেমিক কার্যক্রম থেকে তাঁকে অবিলম্বে অপসারণের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি দ্রুত ঘটনার তদন্ত করে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে উপাচার্যের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা। অভিযোগপত্রের অনুলিপি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই উপ-উপাচার্য, বিভাগীয় সভাপতি, বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি ও প্রেসক্লাবেও পাঠানো হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, “তিনি বিতর্কিত শিক্ষক তাপস কুমার দাশ ও সুপ্রভাত পালের সময়কার অপসংস্কৃতি আবারও প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। তিনি ওই শিক্ষকদের সময়ের শিক্ষার্থী ছিলেন বলে এ ধরনের আচরণে অভ্যস্ত। তিনি প্রকাশ্যে নম্বর টেম্পারিং, হুমকি ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।”
ওই শিক্ষার্থী আরও অভিযোগ করেন, “তিনি ক্লাসে বিভিন্ন অপতথ্য দিয়ে সরকারবিরোধী বক্তব্য দেন। তিনি ক্লাসে এমনও বলেছেন, গত এক মাসে নাকি ১৫ হাজার শিশুর মিসিং ডায়েরি হয়েছে। দেশে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে গ্রেনেড হামলা ও ৬৩ জেলায় সিরিজ বোমা হামলার সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, তারাই এখন ক্ষমতায়। এজন্য এসব হচ্ছে।”
আরেক শিক্ষার্থী বলেন, “তিনি মানসম্মত পাঠদান করতে পারেন না। কিন্তু বিভিন্ন নিয়মকানুন চাপিয়ে দেন। পড়ানোর বিষয়ের সঙ্গে তাঁর লেকচারের কোনো সামঞ্জস্য থাকে না।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষক শামশাদ বাশার বলেন, “আমি লাঞ্চ করছি। এর মধ্যে আসলে কথা বলার মতো পরিবেশ আমার হাতে এই মুহূর্তে নেই। আমরা সামনাসামনি বসে কথা বললে খুব ভালো হয়। আমি আগামীকালও অফিসে থাকব। আপনি আগামীকালও অফিসে এসে কথা বলতে পারেন।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মো. শামছুল আলম বলেন, “আমি অভিযোগের বিষয়টি জেনেছি। আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি।”




