
দেশের নন্দিত অভিনেত্রী ডলি জহুর। কয়েক দশকের অভিনয়জীবনে অসংখ্য নাটক-সিনেমা উপহার দিয়েছেন আর দুহাতে দর্শকের ভালোবাসা কুড়িয়েছেন। সত্তরোর্ধ্ব ডলি জহুর এখনো অভিনয়ে সরব। কিছু দিন আগে একটি পডকাস্টে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন ডলি জহুর। ক্যানসার তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে কেড়ে নিয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনে একা বসবাস করেন। এসব বিষয় নিয়ে নিজের ভাবনার কথা এ আলাপচারিতায় উঠে এসেছে। সঞ্চালক জানতে চান, আপনার পরিবারে প্রথমে আপনার মায়ের ক্যানসার হয়েছিল। তারপর আপনার স্বামী, ভাই-বোনের হয়। এসব কথায় সম্মতি দিয়ে ডলি জহুর বলেন, ‘আমার ছোট বোনের ক্যানসার হয়েছিল। আমার বড় বোনেরও হয়েছিল। ও দেড় বছর আগে মারা গেছে। বড় বোনটা যখন মারা যায়, আমি তখন দেশে ছিলাম না, অস্ট্রেলিয়াতে ছিলাম। আমার ছোট বোনের সেবা করেছি, আমার সামানে আমার কাছে সে মারা গেছে।’
যার ক্যানসার হয় বা যে মারা যান সে তো একজন। কিন্তু আপনি সবার পাশে বটবৃক্ষের মতো থেকেছেন। সঞ্চালকের এসব কথার পরিপ্রেক্ষিতে ডলি জহুর বলেন, ‘এখানে তো আমার একার হাত নেই। ওই যে একজন খেলোয়াড় (সৃষ্টিকর্তা) খেলছেন, উনি উনাদের জন্য আমাকে রেখেছিলেন। আমাকে সবাই বলে—‘তুমি একা থাকো, তোমার কেউ নাই। তোমার যদি কিছু হয়, তাহলে কী হবে?’ এই প্রশ্নটা আমাকে প্রতিনিয়ত করা হয়। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীরাও একই প্রশ্ন করেন। আমি বলি, ‘যে ঘটনাগুলো জীবনে ঘটে গেছে, সেগুলো তো আমি নিজে ঘটাইনি। ওই উনি ঘটালেন। আগামীতে যা ঘটবে, তা তো উনিই ঘটাবেন।
উনার কী এইটুকু মায়া হবে না, সবার জন্য আমাকে রেখেছেন, আমার জন্য কেউ নাই! তাহলে আমাকে কেন কষ্ট দেবেন। দেখো, আমাকে উনি টুস করে তুলে নিয়ে যাবেন।’ সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে জহুরুল হকের সঙ্গে সংসার বাঁধেন ডলি জহুর। তাদের রিয়াসাত নামে একটি পুত্রসন্তান রয়েছে। ছেলে-পুত্রবধূ অস্ট্রেলিয়াতে বসবাস করেন। জহুরুল হক ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ২০০৬ সালে মারা যান। ফলে ডলি জহুর সংসার জীবনে একা।
তাহলে নিঃসঙ্গ সময়ে ডলি জহুর কী করেন? জবাবে এই অভিনেত্রী বলেন, ‘আমার নিঃসঙ্গ লাগে না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময়ে নামাজটা পড়ি। কখনো কখনো বসে কিছুক্ষণ ইবাদত করি। তারপর মোবাইল শয়তান তো আছেই, ওটা নিয়ে বসি, কারো সঙ্গে ফোনে কথা বলি। ফেসবুক ঘাটাঘাটি করি। টেলিভিশন তো একদমই দেখি না। ফেসবুকেই খবরাখবর পাই। একা একা টিভি দেখতে ভালোও লাগে না। আর মোবাইল বা ট্যাব থেকে ইউটিউবে নাটক দেখি।’
আপনি যদি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যান? সঞ্চালকের এই প্রশ্নের জবাবে ডলি জহুর বলেন, ‘ওটা তো উপরওয়ালা জানেন, অসুস্থ হবো কি হবো না, আমি তা জানি না। আমি এটা নিয়ে ভয় পাই না। আমার বিশ্বাস, আল্লাহ আমাকে অসুস্থ করে পচা-গন্ধ করবেন না।’
ছাত্রাবস্থাতেই অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত হন ডলি জহুর। ১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মঞ্চ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে তার অভিনয়যাত্রা শুরু হয়। পরে তিনি ‘নাট্যচক্র’ নাট্যদলে যোগ দেন এবং কিছুদিন পর যুক্ত হন ‘কথক’ নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে। মঞ্চ নাটকে অসামান্য সাফল্যের পর ডলি জহুর পা বাড়ান টিভি নাটকে। নন্দিত কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদের প্রথম নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’ দিয়ে টিভি নাটকে অভিনয় শুরু করেন ডলি জহুর। তারপর থেকে এখনো পর্যন্ত নিয়মিত অভিনয় করে যাচ্ছেন তিনি।
ডলি জহুর অভিনীত ধারাবাহিক নাটকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘একদিন হঠাৎ’, ‘শেষ পত্র’, ‘চুপি চুপি’, ‘বাঘা শের’, ‘স্ক্যান্ডাল’, ‘নোয়াশাল’, ‘মামলাবাজ’, ‘ক্ষণিকালয়’, ‘দহন’, ও ‘গপ্পো’ ইত্যাদি। এছাড়া তিনি কয়েক শতাধিক একক নাটকে অভিনয় করেছেন।
সিনেমায় ডলি জহুরের অভিষেক হয় ‘অসাধারণ’ দিয়ে। এরপর তিনি হুমায়ূন আহমেদের ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘আগুণের পরশমণি’ সিনেমাগুলোতে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসিত হন। এছাড়াও তার অভিনীত সিনেমাগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘দেশপ্রেমিক’, ‘বিক্ষোভ’, ‘আঞ্জুমান’, ‘নয়ন’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘দীপু নাম্বার টু’, ‘বিচার হবে’, ‘অন্ধ ভালোবাসা’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘কুলি’, ‘আমার মা’, ‘বাবা কেন চাকর’, ‘শুধু তুমি’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘অনন্ত ভালোবাসা’, ‘মিলন হবে কতদিনে’, ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’, ‘রং নাম্বার’, ‘ঘানি’, ‘হৃদয়ের কথা’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’, ‘শুভ বিবাহ’, ‘কি যাদু করিলা’, ‘চাঁদের মতো বউ’, ‘মন বসে না পড়ার টেবিলে’, ‘জ্বী হুজুর’ ইত্যাদি।




