
মাদারীপুরে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়ার উপক্রম। চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং ওষুধ সংকটে ব্যাহত হচ্ছে ইউনিয়ন পর্যায়ের চিকিৎসাসেবা। একদিকে নানান সংকট অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম। একজন মাঠ পর্যায়ের পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা দুই থেকে তিনটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের দায়িত্বে রয়েছেন। এরফলে ধুকে ধুকে চলছে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা। এতে বিপাকে পড়েছেন গ্রামের হতদরিদ্র ও অসহায় গর্ভবর্তী নারী ও শিশুসহ সেবা প্রত্যাশী সাধারন মানুষ।
জানা গেছে, মাদারীপুর জেলায় গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য ৪৬ টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। এই কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য মেডিকেল অফিসার (এমসিএইচ-এফপি) ৮ জনের পদ থাকলেও আছে মাত্র ৩ জন। মেডিকেল অফিসার ১২টি পদ থাকলেও একজনও কর্মরত নেই। উপসহকারী মেডিকেল অফিসারের ৬টি পদ শূণ্য। গ্রাম পর্যায়ে যারা মানুষের সাথে সরাসরি কাজ করেন সেই পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা ৯৬টি পদের মধ্যে ৬৩টি পদই শূণ্য, পরিবার কল্যাণ সহকারী ২৬৪ টি পদের মধ্যে ১১৮ টি পদ শূণ্য। এ ছাড়াও অফিস সহায়ক, নিরাপত্তা প্রহরী, আয়াসহ বিভিন্ন পদে সর্বো মোট ২৫৯টি পদ দীর্ঘ দিন ধরে শূণ্য রয়েছে।
সরেজমিন মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়ন, পাঁচখোলা ইউনিয়ন ও ধুলগ্রাম ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে দেখা দেছে, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং ওষুধের সংকট থাকায় ব্যাহত হচ্ছে গ্রামের গরীব ও অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবা। পাশাপাশি প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, ভাঙ্গা ভবন, পানির সমস্যা, বাথরুম ভাঙ্গাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে জেলার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দগুলো। কয়েকটি কেন্দ্রে দেখা গেছে ভবনের ছাদে ফাটল ধরে প্লাস্টার ধসে পড়ছে ও দেয়ালে ফাটল ধরেছে, বাথরুমের প্লাস্টার ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছে, বাথরুম অকেজো হয়ে পড়েছে, কোনটার জানালা ভেঙ্গে গেছে। কোনটার বাথরুম একটু ভালো থাকলেও নেই পানির ব্যবস্থা। পানির মোটর ও চাপ কল চুরি হয়ে গেছে। এরফলে কেন্দ্রগুলোতে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা আবাসিক কোয়াটারে থাকার কথা থাকলেও ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তারা আবাসিক কোয়াটারে এখন থাকছেন না। এরফলে রাতে অসুস্থ্য হয়ে পড়া গর্ভবর্তী মা ও শিশু চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ঝুঁকি নিয়ে যাচ্ছে শহরে।
চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগী জানান, অনেক কষ্ট করে দূর থেকে আসছিলাম ডাক্তার দেখাতে এবং ওষুধের জন্য। ডাক্তার পেলাম না, ওষুধ পেলাম না। সরকার যদি ডাক্তার এবং ওষুধের ব্যবস্থা করতো তাহলে আমরা গ্রামের গরীব মানুষ সহজে চিকিৎসাসেবা পেতাম।
ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পরিদর্শিকারা জানান, আমরা নরমাল ডেলিভারি করে থাকি। বাথরুমে পানি নেই। বাহির থেকে পানি এনে নরমাল ডেলিভারির সরঞ্জামাদি ধুতে হয়। মায়েরা আসলে বাথরুম ব্যবহার করলে পানিটা বাহির থেকে এনে ব্যবহার করতে হয়। এখানে কোন আয়া, পিওন নেই। সপ্তাহে ভাগ করে ডিউটি পালন করতে হয়। একটি কেন্দ্র বন্ধ করে আরেকটি কেন্দ্রে ডিউটি করতে হয়। প্রায় দুই বছর ধরে আমরা কোন ওষুধ পাচ্ছি না। রোগীদেরও দিতে পারছি না।
মাদারীপুর সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি খান মো. শহীদ বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য এই ধরনের ক্লিনিক দরকার। গ্রামের গরীব মানুষ কেন্দ্রগুলোতে গিয়ে যেন চিকিৎসা সেবা পেতে পার তার সুব্যবস্থা করতে হবে। সেখানে ডাক্তার, নার্স, ওষুধসহ প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জামাদি রাখতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারকে বাজাটে বরাদ্দ রাখা জরুরী।
মাদারীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মতিউর রহমান বলেন, প্রতিটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আমরা সেবা প্রদান করছি। কিন্তু প্রতিদিন পারছি না। কারন আমাদের অনেকগুলো পদ শূন্য। রোস্টারিং করে সেবা প্রদান করা হচ্ছে। জনবল সংকট নিরসনে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। সেখানে আমাদের চাহিদা দেয়া আছে। আগামী অক্টোবরের মধ্যে আমরা ওষুধ পেয়ে যাবো।




