
সারাদিনের কাজ শেষে বাসায় ফিরেছেন। শরীরজুড়ে ক্লান্তি, কিন্তু একটু বিশ্রাম নেওয়ারও যেন সুযোগ নেই—কারণ শুরু হয়েছে মাথাব্যথা। কখনো কপালের দুই পাশে চাপ চাপ অনুভূতি, কখনো মাথার এক পাশে ধুকপুক ব্যথা। আবার এমনও হয়, অফিসে গুরুত্বপূর্ণ কাজের মাঝেই মাথাব্যথা শুরু হয়ে যায়। ব্যথার কারণে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, ব্যাহত হয় স্বাভাবিক কাজকর্ম।
অনেকের ক্ষেত্রেই মাথাব্যথা নিয়মিত দেখা দেয়। আর মাথাব্যথা বারবার হলে স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে—এটি কি কোনো বড় বা জটিল রোগের লক্ষণ?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বলছে, বেশির ভাগ মাথাব্যথাই গুরুতর কোনো রোগের কারণে হয় না। স্ট্রেস, ঘুমের অনিয়ম, পানিশূন্যতা, নিয়মিত খাবার না খাওয়া, চোখের ওপর অতিরিক্ত চাপ, ভুল অঙ্গভঙ্গি, অতিরিক্ত ক্যাফেইন বা কিছু ক্ষেত্রে ব্যথানাশক ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহারও মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। তবে মাথাব্যথার ধরন, তীব্রতা বা সঙ্গে থাকা অন্য উপসর্গে পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কেন বারবার মাথাব্যথা হয়?
মাথাব্যথার কারণ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। সবচেয়ে পরিচিত কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে টেনশন বা মানসিক চাপজনিত মাথাব্যথা এবং মাইগ্রেন।
দীর্ঘ সময় কাজ করা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি, ভুল ভঙ্গিতে বসে থাকা কিংবা ঘাড় ও মাথার পেশিতে টান থেকেও মাথাব্যথা হতে পারে। টেনশনজনিত মাথাব্যথায় সাধারণত মাথার দুই পাশে চাপ বা শক্ত করে বাঁধার মতো অনুভূতি হয়।
এ ছাড়া দীর্ঘ সময় কম্পিউটার বা মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা, চোখের সমস্যা, পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া, সময়মতো খাবার না খাওয়া, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ কিংবা হঠাৎ ক্যাফেইন কমিয়ে দেওয়াও মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। অনেক সময় মাথাব্যথার সঙ্গে অন্য কোনো শারীরিক সমস্যাও সম্পর্কিত থাকতে পারে। তাই নিয়মিত মাথাব্যথা হলে শুধু ব্যথা কমানোর ওষুধ খেয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
মাইগ্রেন হলে কেমন মাথাব্যথা হয়?
মাইগ্রেন সাধারণ মাথাব্যথার চেয়ে কিছুটা আলাদা। এতে অনেক সময় মাথার এক পাশে তীব্র বা ধুকপুক ধরনের ব্যথা হয়। আলো, শব্দ বা কখনো গন্ধে অস্বস্তি বাড়তে পারে। বমি বমি ভাব বা বমিও হতে পারে। নড়াচড়া করলে ব্যথা আরও বেড়ে যেতে পারে। একটি মাইগ্রেনের আক্রমণ চিকিৎসা না করলে সাধারণত কয়েক ঘণ্টা থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মাথাব্যথা শুরু হওয়ার আগে ‘অরা’ নামে পরিচিত কিছু সাময়িক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে চোখের সামনে ঝিলিক বা জিগজ্যাগ রেখা দেখা, দৃষ্টিতে পরিবর্তন, হাত-পায়ে ঝিনঝিন অনুভূতি, মাথা ঘোরা কিংবা কথা বলতে সাময়িক অসুবিধা থাকতে পারে। সাধারণত এসব উপসর্গ এক ঘণ্টার মধ্যে চলে যায়। মাইগ্রেনের ক্ষেত্রে স্ট্রেস, ক্লান্তি, ঘুমের পরিবর্তন, সময়মতো খাবার না খাওয়া, অতিরিক্ত ক্যাফেইন, হরমোনের পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয় ট্রিগার হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে একই কারণ কাজ করে না।
মাথাব্যথা হলেই কি ব্রেন টিউমার?
ঘন ঘন মাথাব্যথা হলেই ব্রেন টিউমার বা অন্য কোনো ভয়ংকর রোগ হয়েছে—এমন ধারণা ঠিক নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, বেশির ভাগ মাথাব্যথা গুরুতর কোনো অন্তর্নিহিত রোগের লক্ষণ নয়। তবে নতুন ধরনের মাথাব্যথা, আগের চেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা ব্যথা বা মাথাব্যথার ধরনে হঠাৎ বড় পরিবর্তন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে কোনো ব্যক্তির আগে নিয়মিত মাথাব্যথার ইতিহাস না থাকলেও হঠাৎ নতুন ধরনের ব্যথা শুরু হলে সেটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। একইভাবে বয়স বাড়ার পর নতুন করে মাথাব্যথা শুরু হলেও চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ, মাথাব্যথা নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কিত হওয়ার যেমন প্রয়োজন নেই, তেমনি বারবার হওয়া বা অস্বাভাবিক ধরনের ব্যথাকে অবহেলাও করা উচিত নয়।
অতিরিক্ত ব্যথানাশকও কি মাথাব্যথার কারণ?
মাথাব্যথা হলেই অনেকেই নিজের মতো করে ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে নেন। এতে সাময়িকভাবে ব্যথা কমলেও নিয়মিত ও অতিরিক্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রে উল্টো মাথাব্যথা আরও ঘন ঘন হতে পারে। এটিকে ‘মেডিকেশন ওভারইউজ হেডেক’ বা ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে হওয়া মাথাব্যথা বলা হয়।
তাই ঘন ঘন মাথাব্যথা হলে প্রতিবার নিজের মতো করে ওষুধ খাওয়ার পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। বিশেষ করে সপ্তাহে একাধিকবার মাথাব্যথা হলে এর কারণ চিহ্নিত করা জরুরি। মাইগ্রেনের ক্ষেত্রেও ঘন ঘন আক্রমণ হলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
মাথাব্যথা যদি নিয়মিত হয়, আগের তুলনায় বেশি তীব্র হয়, কাজ বা ঘুমে বাধা সৃষ্টি করে কিংবা সাধারণ ব্যবস্থায় কমতে না চায়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে মাথাব্যথার ধরনে পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।
চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে একটি ‘হেডেক ডায়েরি’ রাখা উপকারী হতে পারে। কখন ব্যথা শুরু হচ্ছে, কতক্ষণ থাকছে, মাথার কোন অংশে হচ্ছে, ব্যথার তীব্রতা কেমন, তার আগে কী খাওয়া হয়েছিল, কত ঘণ্টা ঘুম হয়েছে, মানসিক চাপ ছিল কি না এবং কোনো ওষুধ নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব লিখে রাখলে মাথাব্যথার সম্ভাব্য কারণ বা ট্রিগার শনাক্ত করতে চিকিৎসককে সহায়তা করতে পারে।
কোন লক্ষণে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন?
সব মাথাব্যথা জরুরি নয়। তবে কিছু লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। যেমন—হঠাৎ বজ্রপাতের মতো অত্যন্ত তীব্র মাথাব্যথা শুরু হওয়া, মাথায় আঘাতের পর মাথাব্যথা, মাথাব্যথার সঙ্গে শরীরের এক পাশে দুর্বলতা বা অবশভাব, কথা বলতে সমস্যা, দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন, খিঁচুনি, বিভ্রান্তি বা অচেতন হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেওয়া।
এ ছাড়া উচ্চ জ্বর ও ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার সঙ্গে মাথাব্যথা, হাঁটা বা ভারসাম্য রাখতে সমস্যা, বারবার বমি কিংবা হঠাৎ নতুন ধরনের তীব্র মাথাব্যথাও জরুরি মূল্যায়নের কারণ হতে পারে। এসব উপসর্গ দেখা দিলে শুধু সাধারণ মাথাব্যথা ভেবে বাড়িতে বসে থাকা উচিত নয়; দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
মাথাব্যথা কমাতে কী করা যায়?
মাথাব্যথার কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা আলাদা। তবে সাধারণভাবে পর্যাপ্ত পানি পান করা, নিয়মিত খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম, অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা উপকারী হতে পারে। দীর্ঘ সময় একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে বিরতি নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
মাইগ্রেনের ক্ষেত্রে অন্ধকার ও শান্ত ঘরে বিশ্রাম নেওয়া এবং ব্যক্তিগত ট্রিগারগুলো এড়িয়ে চলা অনেকের জন্য উপকারী হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট খাবার, ঘুমের পরিবর্তন, স্ট্রেস বা অন্য কোনো বিষয় মাইগ্রেনের আক্রমণ বাড়াতে পারে। তাই নিজের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো মাথাব্যথা বাড়ায়, তা শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।
আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই গুরুত্বপূর্ণ:
ঘন ঘন মাথাব্যথা হওয়া মানেই বড় কোনো রোগের ইঙ্গিত—এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এর পেছনে থাকে মাইগ্রেন, টেনশন, ঘুমের অনিয়ম, পানিশূন্যতা, খাবারের অনিয়ম কিংবা দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন অভ্যাস। তবে মাথাব্যথার ধরন বদলে গেলে, ব্যথা ক্রমেই বাড়তে থাকলে বা এর সঙ্গে স্নায়বিক কিংবা অন্যান্য অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নিজে থেকে রোগ নির্ণয় না করে মাথাব্যথার ধরন ও নিয়মিততা পর্যবেক্ষণ করা। বিশেষ করে যারা নিয়মিত মাইগ্রেনে ভোগেন, তাদের জন্য মাথাব্যথার সময়, তীব্রতা, সম্ভাব্য ট্রিগার এবং ব্যবহৃত ওষুধের হিসাব রাখা কার্যকর হতে পারে।
তাই প্রতিবার মাথাব্যথা হলেই ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার নিয়মিত মাথাব্যথাকে স্বাভাবিক ভেবে বছরের পর বছর চিকিৎসা ছাড়াও থাকা উচিত নয়। মাথাব্যথা শরীরের একটি সংকেত—তার ধরন বুঝে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।




