
নীরব পরিবেশে হঠাৎ কানে শোঁ শোঁ, টেলিভিশনের ঝিরঝির, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক কিংবা ঘণ্টার মতো শব্দ শুনতে পাওয়া অনেকেরই পরিচিত অভিজ্ঞতা। আশপাশে এমন কোনো শব্দের উৎস না থাকলেও কানে এ ধরনের শব্দ শোনা গেলে তাকে টিনিটাস বলা হয়।
টিনিটাস নিজে কোনো নির্দিষ্ট রোগ নয়; বরং এটি বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার একটি উপসর্গ হতে পারে। কখনো সাময়িকভাবে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনও স্থায়ী হতে পারে। তাই বারবার বা দীর্ঘস্থায়ীভাবে কানে অস্বাভাবিক শব্দ হলে বিষয়টি অবহেলা না করে কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
টিনিটাসে কেমন শব্দ শোনা যায়?
টিনিটাসের শব্দ সবার ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। কেউ ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের মতো শব্দ শুনতে পারেন, আবার কারও কাছে এটি ঘণ্টা বাজা, হিসহিস, সমুদ্রের গর্জন কিংবা যন্ত্রের শব্দের মতো মনে হতে পারে। শব্দের তীব্রতাও ব্যক্তি ও কারণভেদে ভিন্ন হতে পারে। এক কানে বা দুই কানেই এই শব্দ অনুভূত হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে এটি সারাক্ষণ থাকে, আবার কারও ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পরপর দেখা দেয়।
দীর্ঘস্থায়ী টিনিটাসের কারণে মনোযোগে সমস্যা, ঘুমের ব্যাঘাত, বিরক্তি, উদ্বেগ ও দৈনন্দিন কাজে অসুবিধা হতে পারে।
টিনিটাসের সম্ভাব্য কারণ
কানের সংক্রমণ বা অতিরিক্ত ময়লা: সর্দি, সাইনাস বা কানের সংক্রমণের কারণে কানের ভেতরে চাপ তৈরি হতে পারে। আবার অতিরিক্ত কানের ময়লা বা খৈল জমে শ্রবণপথে বাধা তৈরি হলেও টিনিটাস হতে পারে।
মাথায় আঘাত: মাথায় আঘাত বা কনকাশনের পরও কানে অস্বাভাবিক শব্দ শোনা যেতে পারে। বিশেষ করে মাথার এক পাশে আঘাত লাগলে এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
মাইগ্রেন: মাইগ্রেনের সঙ্গে কিছু মানুষের কান বন্ধ লাগা, শ্রবণশক্তির পরিবর্তন কিংবা টিনিটাসের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
চোয়ালের সমস্যা: কানের কাছের টেম্পোরোম্যান্ডিবুলার জয়েন্টে (টিএমজে) সমস্যা বা আঘাতের কারণেও টিনিটাস হতে পারে। টিনিটাসের পাশাপাশি চোয়াল বা দাঁতে সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ওষুধের সমস্যা: নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও কানে অস্বাভাবিক শব্দ হতে পারে। বিশেষ করে কিছু ওষুধ বেশি মাত্রায় গ্রহণের সঙ্গে টিনিটাসের সম্পর্ক থাকতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন করা উচিত নয়।
কানের হাড়ের সমস্যা: অটোস্ক্লেরোসিসের মতো কিছু সমস্যায় মধ্যকানের হাড়ে অস্বাভাবিক পরিবর্তন হতে পারে। এর ফলে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার পাশাপাশি টিনিটাসও দেখা দিতে পারে।
মানসিক চাপ: অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও উদ্বেগের সঙ্গে টিনিটাসের তীব্রতা বাড়তে পারে। নিয়মিত অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে উপসর্গকে প্রভাবিত করতে পারে।
আরও যেসব সমস্যার সঙ্গে টিনিটাসের সম্পর্ক থাকতে পারে
মেনিয়ার্স ডিজিজ, ইউস্টেশিয়ান টিউবের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তনালির কিছু সমস্যা, ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা, অ্যানিমিয়া এবং কিছু অটোইমিউন রোগের সঙ্গেও টিনিটাসের সম্পর্ক থাকতে পারে। বিরল ক্ষেত্রে মাথা বা ঘাড়ের কিছু টিউমারের সঙ্গেও এটি যুক্ত হতে পারে।
তাই দীর্ঘদিন টিনিটাস থাকলে শুধু শব্দ বন্ধ করার চেষ্টা না করে এর প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
যে কারও টিনিটাস হতে পারে। তবে কিছু কারণে ঝুঁকি বাড়তে পারে। যেমন—
• দীর্ঘসময় উচ্চ শব্দের মধ্যে থাকা
• উচ্চ শব্দে গান বা অন্য অডিও শোনা
• ভারী যন্ত্রপাতির শব্দের মধ্যে কাজ করা
• বয়স বাড়ার সঙ্গে শ্রবণশক্তির পরিবর্তন
• ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণ
• উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগসহ কিছু শারীরিক সমস্যা
• মাথায় আঘাতের ইতিহাস
উচ্চ শব্দ থেকে কানকে সুরক্ষিত রাখা তাই গুরুত্বপূর্ণ। কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত শব্দ থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী কানের সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করা যেতে পারে।
টিনিটাস হলে কী করবেন?
প্রথমেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ টিনিটাসের অনেক কারণই চিকিৎসাযোগ্য। তবে শব্দটি বারবার হলে, দীর্ঘস্থায়ী হলে বা এর সঙ্গে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, মাথা ঘোরা, কানে ব্যথা কিংবা অন্য কোনো উপসর্গ থাকলে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কানের ভেতর অতিরিক্ত ময়লা জমেছে কি না, কানের সংক্রমণ রয়েছে কি না কিংবা শ্রবণশক্তিতে কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না—চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী এসব পরীক্ষা করতে পারেন।
নিজে থেকে কানের ভেতর কাঠি, কটনবাড বা অন্য কোনো সরু বস্তু ঢুকিয়ে ময়লা পরিষ্কার করা উচিত নয়। এতে কানের ক্ষতি হতে পারে এবং ময়লা আরও ভেতরে চলে যেতে পারে।
উচ্চ শব্দ এড়িয়ে চলা, অতিরিক্ত ক্যাফেইন কমানো, ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখাও উপকারী হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী কানের ভেতর পরীক্ষা, শ্রবণশক্তি পরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষা করতে পারেন। কানে অতিরিক্ত ময়লা, সংক্রমণ, শ্রবণশক্তির সমস্যা, কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা অন্য কোনো শারীরিক কারণ আছে কি না, তা দেখে চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া হয়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টিনিটাসের কারণ সবার ক্ষেত্রে এক নয়। তাই নিজের মতো করে ওষুধ খাওয়া, কানের ভেতর কটনবাড বা কোনো বস্তু ঢোকানো কিংবা নির্দিষ্ট কোনো ব্যায়ামকে সবার জন্য চিকিৎসা হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়াই নিরাপদ।




