
স্তন ক্যানসার নিয়ে সমাজে নানা ধরনের ভুল ধারণা বা মিথ প্রচলিত রয়েছে। এসব ধারণার অনেকগুলোরই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ফলে রোগটি নিয়ে অযথা ভয় ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। স্তন ক্যানসার সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা এবং প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।
ব্রেস্টক্যানসার.ওআরজি’র এক প্রতিবেদনে স্তন ক্যানসার নিয়ে প্রচলিত কয়েকটি মিথ তুলে ধরে সেগুলোর বাস্তবতা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
অনেকে মনে করেন, পরিবারের কারও স্তন ক্যানসার না থাকলে নিজেরও এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। বাস্তবে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষেরই পারিবারিকভাবে এ রোগের ইতিহাস থাকে না। ধারণা করা হয়, স্তন ক্যানসারের মাত্র প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ বংশগত কারণে হয়ে থাকে।
স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত ব্যায়াম করা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং অ্যালকোহল গ্রহণ সীমিত করা স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে এসব অভ্যাস এ রোগের ঝুঁকি সম্পূর্ণভাবে দূর করতে পারে না।
বিশেষ করে আন্ডারওয়্যার ব্রা স্তনে লসিকা প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে এবং এর ফলে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে—এমন একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ব্রা ব্যবহারের সঙ্গে স্তন ক্যানসারের সরাসরি কোনো প্রমাণিত সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
আন্ডারআর্ম অ্যান্টিপার্সপিরেন্ট ব্যবহারের সঙ্গে স্তন ক্যানসারের যোগসূত্র রয়েছে—এমন শক্ত প্রমাণও নেই। অ্যালুমিনিয়ামযুক্ত কিছু পণ্য ব্যবহারে স্তনের টিস্যুতে অ্যালুমিনিয়ামের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে—এমন কিছু গবেষণা থাকলেও এর সঙ্গে স্তন ক্যানসারের সম্পর্ক এখনো প্রমাণিত হয়নি।
ব্রা কিংবা বুকের পকেটে মোবাইল ফোন রাখলে স্তন ক্যানসার হতে পারে—এমন দাবিরও কোনো প্রমাণ নেই। মোবাইল ফোন থেকে নির্গত রেডিওফ্রিকোয়েন্সি রেডিয়েশন নিয়ে গবেষণা চলমান থাকলেও এখন পর্যন্ত এর সঙ্গে স্তন ক্যানসারের কোনো প্রমাণিত যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।
চিনি খেলেই সরাসরি স্তন ক্যানসার হয়—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ক্যানসার কোষ যেমন গ্লুকোজ ব্যবহার করে, তেমনি শরীরের সুস্থ কোষও গ্লুকোজ ব্যবহার করে। তবে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ফলে ওজন বেড়ে যেতে পারে। আর অতিরিক্ত ওজন স্তন ক্যানসারের অন্যতম ঝুঁকির কারণ হিসেবে বিবেচিত।
আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো, বছরে একবার ম্যামোগ্রাম করালেই স্তন ক্যানসার নিশ্চিতভাবে শুরুতেই ধরা পড়বে। বাস্তবে ম্যামোগ্রাম প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলেও এটি শতভাগ নির্ভুল নয়। কিছু ক্ষেত্রে পরীক্ষায় ক্যানসার ধরা নাও পড়তে পারে।
আবার স্তন ক্যানসার হলেই হাতে অনুভব করা যায় এমন গুটি থাকবে—এটিও ভুল ধারণা। বিশেষ করে রোগের শুরুতে সবসময় গুটি নাও থাকতে পারে। ত্বকের মাধ্যমে অনুভূত যেকোনো নতুন গুটি বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কারণ হতে পারে।
প্রাথমিক পর্যায়ের স্তন ক্যানসার হলে পরে আর ফিরে আসার ঝুঁকি নেই—এমন ধারণাও ঠিক নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুনরায় ক্যানসার ফিরে আসে না, তবে ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। পাঁচ বছর পরও কিছু ক্ষেত্রে রোগ ফিরে আসতে পারে।
সবশেষে, সব ধরনের স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা একই—এটিও ভুল। ক্যানসারের ধরন, আকার, পর্যায়, গ্রেড, হরমোন রিসেপ্টর, HER2 জিনসহ বিভিন্ন বিষয় এবং রোগীর পছন্দের ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে। ফলে একজন রোগীর চিকিৎসা পরিকল্পনা অন্যজনের থেকে ভিন্ন হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, স্তন ক্যানসার শুধু মধ্যবয়সী বা বয়স্ক নারীদের হয় না; কম বয়সী নারীদেরও এ রোগ হতে পারে। পুরুষদের মধ্যেও স্তন ক্যানসার হতে পারে, যদিও তা বিরল।
তাই স্তন ক্যানসার নিয়ে প্রচলিত নানা গুজব বা অর্ধসত্যের ওপর নির্ভর না করে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত তথ্য জানা জরুরি। একই সঙ্গে কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।




