
ভারতে জন্ম নেয়া দুইজন নারী, যাদের শিশু অবস্থায় ভিন্ন ভিন্ন পরিবার দত্তক নিয়েছিল এবং নেদারল্যান্ডসে কাছাকাছি এলাকায় বড় করা হয়েছিল, তারা চল্লিশ পেরিয়ে এখন জানতে পেরেছেন যে তারা জৈবিকভাবে দুই বোন।
বর্তমানে ৪৩ বছর বয়সী মীনা দিনটির কথা স্পষ্টভাবে মনে করতে পারেন। মূল অনুষ্ঠানটি শনিবারের জন্য নির্ধারিত ছিল, যেখানে দত্তক নেয়া পরিবারগুলো একত্রিত হতো। শুক্রবার সন্ধ্যায় দত্তক নেয়া সব শিশুদের একত্র করা হয়েছিল, যাতে তারা একসঙ্গে সময় কাটাতে পারে, বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পারে এবং রাতের খাবার খেতে পারে।
মীনা ও মিনাল দুজনেই তখন বন্ধুদের সঙ্গে ছিলেন। তাদের বন্ধুরাই লক্ষ্য করেন যে দুজনকে দেখতে কতটা একই রকম এবং তাদের পরিচয় করিয়ে দেন। মীনা বলেন, বন্ধুরা বলেছিল, নিজেদের আয়নায় দেখো। আর আমি বললাম, ওহ ঈশ্বর, তার নাকটা আমার মতো! আমাদের হাসিটাও একই রকম। রাতের খাবারের সময় আমি সারাক্ষণ ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। পরের দিনের সভায় তারা পরস্পরের টেলিফোন নম্বর ও ঠিকানা বিনিময় করেন এবং যোগাযোগ রাখার প্রতিশ্রুতি দেন। বহু বছর ধরে তারা একে অপরকে চিঠি লিখেছেন, প্রায়ই সম্বোধন করেছেন ‘বোন’ বলে। কারণ, তারা এমনটাই অনুভব করতেন বলে জানান।
তারা স্কুল, বন্ধু, ছেলেদের নিয়ে কথা বলতেন, বাইরে যাওয়া ও নাচ নিয়ে লিখতেন। তারা নিজেদের খেলাধুলার অভিজ্ঞতা ভাগ করতেন এবং সংগীত নিয়ে আলোচনা করতেন। এভাবেই তারা আবিষ্কার করেন যে দুজনেই ব্যাকস্ট্রিট বয়েজের ভক্ত। এরপর ১৫ বছর আগে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
বর্তমানে তিন সন্তানের মা মীনা বলেন, তখনই তার প্রথম সন্তান জন্ম নেয় এবং তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আর মিনাল চলে যান ফ্রান্সে। ২০১৭ সালে ভারত থেকে দত্তক নেয়া ব্যক্তিদের আরেকটি সমাবেশে যোগ দেন মীনা। সেখানে তিনি ডিএনএ পরীক্ষার কথা শোনেন এবং নিজেও পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত নেন।
প্রায় এক দশক ধরে কারো সঙ্গে কোনো মিল খুঁজে পাননি। এ বছরের শুরুর দিকে ফোনে জায়গার সংকট হওয়ায় তিনি অ্যাপটি মুছে দেন। মীনা বলেন, ২০ মে আমি ফেসবুকে মিনালের কাছ থেকে একটি বার্তা পাই। সে লিখেছিল, আমাকে মনে আছে? নেদারল্যান্ডসে বাবা-মায়ের কাছে বেড়াতে গিয়ে এপ্রিল মাসে সে পরীক্ষা করিয়েছিল। সে তার পরীক্ষার ফলাফলের একটি স্ক্রিনশটও পাঠিয়েছিল। আমি অ্যাপটি আবার ইনস্টল করি। এতটাই নার্ভাস ছিলাম যে লগইন করার আগে ১০ বার ভুল পাসওয়ার্ড দিই। ফলাফল ছিল একেবারে স্পষ্ট। সেখানে দেখা যায়, তার সঙ্গে শতভাগ মিল রয়েছে।
মীনা জানান, মনে হচ্ছিল যেন শরীরে অ্যাড্রেনালিনের প্রবল স্রোত বয়ে গেছে। আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। মিনাল ছিল আমার জীবনের হারিয়ে যাওয়া ধাঁধার টুকরো, যার জন্য আমি এত দিন অপেক্ষা করেছি। আমরা একে অপরকে বোন বলে ডাকতাম। এই ডিএনএ মিল ছিল সেই সত্যের প্রমাণ যে আমাদের অনুভূতি ঠিকই ছিল।
মীনা বলেন, অগাস্টের এক সুন্দর রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে পুরোনো দুই বন্ধু প্রথমবারের মতো দুই বোন হিসেবে একটি পার্কে দেখা করেন। অসাধারণ ছিল। মনে হচ্ছিল যেন বাড়ি ফিরে এসেছি। বহু বছর ধরে আমি ও মিনাল হৃদয়ের মধ্যে একটি বড় শূন্যতা অনুভব করতাম। এখন মনে হচ্ছে আমরা সম্পূর্ণ হয়েছি। এখন সবকিছুই যেন ঠিক এভাবেই হওয়ার কথা ছিল।
তাদের আবেগঘন পুনর্মিলন নিয়ে রয়টার্স লিখেছে, তাদের সাক্ষাৎজুড়ে ছিল কান্না, আলিঙ্গন ও হাসি... এরপর তারা একসঙ্গে প্রথম সেলফি তোলে।
৪৪ বছর বয়সী মিনাল, যিনি তার সঙ্গী ও দুই ছেলেকে নিয়ে ফ্রান্সে থাকেন। রয়টার্সকে তিনি বলেন, এপ্রিল মাসে ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল পাওয়ার পর প্রথমে তিনি বুঝতেই পারেননি যে এটি সেই একই কিশোরী, যিনি ৩০ বছর আগে প্রথম সাক্ষাতের সময় তাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মীনার ছবি দেখার পরই তার উপলব্ধি হয়। মিনা তার বোন। তিনি বলেন, আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। আমরা বোন হওয়ার আগে বন্ধু ছিলাম। আমরা সব সময়ই বোন ছিলাম, শুধু সেটা জানতাম না।
আশির দশকে নেদারল্যান্ডসের দুই ভিন্ন দম্পতি মীনা ও মিনালকে মুম্বাইয়ের দুটি আলাদা অনাথ আশ্রম থেকে দত্তক নেন। মীনা বলেন, তিনি নেদারল্যান্ডসের একটি ছোট গ্রামে অত্যন্ত স্নেহময় পরিবারে বড় হয়েছেন। কয়েক বছর আগে তার বাবা মারা গেছেন, তবে মা এখনও সেই একই গ্রামে বসবাস করেন।
মীনা আরও বলেন, আমরা প্রতিদিন কথা বলি। তিনি এখনো আমার নিরাপদ আশ্রয়। ২০০৩ সালে, যখন মীনার বয়স ১৯, তখন তিনি তার বাবা-মা ও গোয়া থেকে দত্তক নেয়া ভাইকে নিয়ে মুম্বাইয়ের সেই অনাথ আশ্রমে যান। তারা দুই সপ্তাহ ধরে নথিপত্র খুঁজে দেখেন, মীনার জৈবিক বাবা-মায়ের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন। কারণ আমার জন্য জানা গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমি কোথা থেকে এসেছি, আমার মা কে ছিলেন? কিন্তু অনাথ আশ্রম তাদের সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
মে মাস থেকে মীনা ও মিনাল এক দিন পরপর কথা বলে আসছেন। তারা একে অপরের জীবনসঙ্গী, সন্তান, ভাই এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। সবাই লক্ষ্য করে যে আমরা কীভাবে একে অপরের বাক্য শেষ করি, কীভাবে একই ধরনের ভঙ্গিতে মাথা নাড়ি বা হাঁটি।
তারা যে সত্যিই দুই বোন, সেই বিষয়টি এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করার চেষ্টা করছেন বলে জানান মীনা। তিনি বলেন, তারা হারিয়ে যাওয়া সময়ের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।




