
উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের কাছে জার্মানি অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য। তুলনামূলক কম শিক্ষাব্যয়, উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সহায়তা, পড়াশোনা শেষে চাকরির সুযোগ এবং জীবনযাত্রার মান—সব মিলিয়ে প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা জার্মানিতে পড়তে যান।
কিউএসের সেরা শিক্ষার্থী শহরের তালিকায় জার্মানির তিনটি শহরও রয়েছে। এর মধ্যে মিউনিখ সবচেয়ে ওপরে, এরপর রয়েছে রাজধানী বার্লিন ও স্টুটগার্ট। শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ, বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং বসবাসের উপযোগিতার কারণে এসব শহর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয়।
জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাব্যবস্থাতেও ব্যবহারিক জ্ঞানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা শুধু শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা নয়, বাস্তব কর্মক্ষেত্রে সেই জ্ঞান প্রয়োগের সুযোগও পান। দেশটির বেশ কিছু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্যও তুলনামূলক কম বা কোনো টিউশন ফি নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রদেশভেদে ফি-এর নিয়ম আলাদা হতে পারে।
জার্মানিতে শিক্ষার্থী ভিসার ধরন
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে বসবাসকারী শিক্ষার্থীদের জন্য জার্মানিতে পড়াশোনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ভিসার ব্যবস্থা রয়েছে।
সাধারণ শিক্ষার্থী ভিসা: স্নাতক, স্নাতকোত্তর বা গবেষণা কর্মসূচিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা এই ভিসার জন্য আবেদন করতে পারেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সন্ধানের ভিসা: যারা জার্মানিতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ খুঁজতে চান, তাদের জন্য এই ভিসা।
ভাষা শেখার ভিসা: জার্মান ভাষার নিবিড় কোর্সে ভর্তি শিক্ষার্থীদের জন্য এই ভিসা দেওয়া হয়।
এ ছাড়া জার্মান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করা শিক্ষার্থীরা চাকরি খোঁজার জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দেশটিতে থাকার অনুমতিও পেতে পারেন।
ভিসার জন্য যেসব কাগজ লাগবে
জার্মানির শিক্ষার্থী ভিসার আবেদনের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রয়োজন হয়—বৈধ পাসপোর্ট, স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি বা গ্রহণপত্র, পর্যাপ্ত অর্থের প্রমাণ, স্বাস্থ্যবিমার প্রমাণ, জার্মান বা ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার প্রমাণ (যদি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তা চায়), বায়োমেট্রিক ছবি, জার্মানিতে থাকার ঠিকানার প্রমাণ, ভিসা আবেদনের ফি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক বছরের জন্য অন্তত ১১ হাজার ৯০৪ পাউন্ড সমপরিমাণ অর্থের আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ দেখাতে হতে পারে। এটি ব্যাংক হিসাব, বৃত্তি বা স্পনসরের মাধ্যমে দেখানো যেতে পারে। তবে আবেদনকারীর দেশ ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে পরিবর্তন হতে পারে।
ভাষা জানার শর্ত
জার্মান শিক্ষার্থী ভিসার জন্য সবার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো ভাষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক নয়। তবে দৈনন্দিন জীবনযাপনে সুবিধার জন্য জার্মান সরকার অন্তত বি১ পর্যায়ের জার্মান ভাষাজ্ঞান থাকার পরামর্শ দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয় বা নির্দিষ্ট কোর্সে ভর্তির ক্ষেত্রে জার্মান অথবা ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার প্রমাণ চাওয়া হতে পারে। জার্মান ভাষার দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য গোয়েথে-জার্টিফিকেট ও টেস্টডাফের মতো পরীক্ষা প্রচলিত।
জার্মানিতে পড়তে কত খরচ?
জার্মানিতে শিক্ষার্থীদের প্রধান খরচের মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়। অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্যও টিউশন ফি নেই। তবে সব বিশ্ববিদ্যালয় বা সব প্রদেশে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।
জার্মান একাডেমিক এক্সচেঞ্জ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, একজন শিক্ষার্থীর মাসে গড়ে প্রায় ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ পাউন্ড পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এর মধ্যে বাসাভাড়া, খাবার, স্বাস্থ্যবিমা, যাতায়াত, ফোন ও ইন্টারনেট, পড়াশোনার উপকরণ এবং বিনোদনের খরচ অন্তর্ভুক্ত।
কীভাবে আবেদন করবেন?
প্রথমে জার্মানির পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্স নির্বাচন করে আবেদন করতে হবে। ভর্তি নিশ্চিত হলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রহণপত্র নিতে হবে।
এরপর আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ প্রস্তুত করতে হবে। এর মধ্যে এক বছরের খরচের জন্য ব্লকড ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বৃত্তির প্রমাণ অথবা জার্মানিতে থাকা কোনো ব্যক্তির আর্থিক দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা থাকতে পারে।
সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে কনস্যুলার সার্ভিসেস পোর্টাল অথবা সংশ্লিষ্ট জার্মান দূতাবাসে আবেদন করতে হবে। ভিসা সাক্ষাৎকারে পড়াশোনা, অর্থের উৎস এবং পড়াশোনা শেষে পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হতে পারে।
ভিসা অনুমোদন হলে জার্মানিতে গিয়ে নতুন ঠিকানা নিবন্ধন করতে হবে, স্বাস্থ্যবিমা সক্রিয় করতে হবে এবং ব্যাংক হিসাব খুলতে হবে। প্রবেশ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে স্থানীয় বিদেশি নাগরিক দপ্তর থেকে আবাসিক অনুমতিও নিতে হবে।
শিক্ষার্থীরা কী করতে পারবেন?
জার্মান শিক্ষার্থী ভিসাধারীরা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করতে পারেন। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সেমিস্টার চলাকালে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজ এবং ছুটির সময়ে পূর্ণকালীন কাজের সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বৈধ জার্মান ভিসা থাকলে শেনজেন এলাকার বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করা যায় এবং নিজ দেশেও যাওয়া-আসা করা যায়।
তবে অনুমোদিত সময়ের বেশি কাজ করা বা পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া যাবে না। স্থায়ী বাসিন্দা বা নাগরিকদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু সরকারি সুবিধাও শিক্ষার্থী ভিসাধারীরা পাবেন না।
জার্মানির কয়েকটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়
কিউএসের তালিকা অনুযায়ী জার্মানির উল্লেখযোগ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব মিউনিখ
২. লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান ইউনিভার্সিটি অব মিউনিখ
৩. হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়
৪. ফ্রি ইউনিভার্সিটি অব বার্লিন
৫. আরডব্লিউটিএইচ আচেন বিশ্ববিদ্যালয়
৬. কার্লসরুহে ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি
৭. হামবোল্ট ইউনিভার্সিটি অব বার্লিন
৮. টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব বার্লিন
৯. টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব ড্রেসডেন
বন বিশ্ববিদ্যালয়
ভিসা ও অভিবাসন সংক্রান্ত নিয়ম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে জার্মান সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও স্থানীয় জার্মান দূতাবাসের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি।
সূত্র: এনডিটিভি




