
দীর্ঘদিন ধরে চলা শিক্ষার্থী নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ, দুর্নীতির অভিযোগ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই পদত্যাগ করেছেন দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান অঞ্চলের দেশ সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্ডার ভুসিচ।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে আগাম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পথ খুলে গেল।
ভুসিচের পদত্যাগের সময়টিতে সার্বিয়ায় আগামী ২৫ অক্টোবর আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে তার পদত্যাগের ফলে নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী, ভুসিচ তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না।
তবে প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়লেও রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছেন না ভুসিচ। আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনে তার দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি (এসএনএস) সরকার গঠন করতে পারলে তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য প্রার্থী হবেন বলে জানিয়েছেন।
পদত্যাগের আগে রাজধানী বেলগ্রেডে প্রেসিডেন্ট ভবনের সামনে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন ভুসিচ। সেখানে তিনি দীর্ঘ প্রায় নয় বছর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় দেশটিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কথা তুলে ধরেন।
ভুসিচ এর আগেই গত জুনে পদত্যাগের ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। তখন তিনি আগাম প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচনের কথাও জানিয়েছিলেন। তার পদত্যাগের পর নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং ততদিন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন পার্লামেন্টের স্পিকার আনা ব্রনাবিচ।
এদিকে ২০২৪ সালের নভেম্বরে নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর থেকে সার্বিয়ায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে এসব আন্দোলন সরকারবিরোধী বৃহত্তর বিক্ষোভে রূপ নেয়। ভুসিচ ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিযোগও তুলেছে বিভিন্ন অধিকার সংগঠন; তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে সরকার।
রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত এই নেতার সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন কাজে নিয়মকানুন এড়িয়ে চলা এবং অনিয়মের অভিযোগে ক্ষোভ রয়েছে। ২০২৪ সালে নোভি সাদ রেলস্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনা সেই ক্ষোভ বড় ধরনের বিক্ষোভে রূপ নেয়। এরপর শিক্ষার্থী ও শিক্ষক থেকে শুরু করে শ্রমিক ও কৃষক—সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে যোগ দেন।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ওই দুর্ঘটনা ভুসিচের প্রগ্রেসিভ পার্টির এক দশকের বেশি সময়ের শাসনামলের নানা অনিয়মের চিত্র সামনে এনেছে। রেলস্টেশনটির সংস্কারকাজের সঙ্গে ভুসিচ নিজেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। সংস্কারের পর স্টেশনটিকে সার্বিয়ার অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।
অবশ্য আন্দোলনের মুখে ভুসিচের সরকারের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির পদত্যাগেও বিক্ষোভ থামেনি। পুরো গ্রীষ্মজুড়েই আন্দোলন চলতে থাকে। পরে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠার পর বিক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
বিবিসি বলছে, সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভুসিচের মেয়াদ আগামী বছর শেষ হওয়ার কথা ছিল। সার্বিয়ার সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে হবে। এর ফলে চলতি বছরের শেষ হওয়ার আগেই সার্বিয়ার মানুষকে দুইবার ভোট দিতে হবে।
ভুসিচ জানিয়েছেন, আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনের এক মাসেরও বেশি সময় পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অক্টোবরে আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। দীর্ঘদিনের বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতেই এই নির্বাচন ডাকা হয়েছে। আন্দোলনকারীরাও তাদের দাবির মধ্যে নতুন নির্বাচনের বিষয়টি যুক্ত করেছিলেন।
এর আগে ভুসিচ জানিয়েছিলেন, প্রগ্রেসিভ পার্টির নেতা হিসেবে তিনি ওই নির্বাচনে লড়বেন। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়লেও দেশের রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে থাকার সুযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।
এদিকে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রগ্রেসিভ পার্টির সদস্য আনা ব্রনাবিচ।
সার্বিয়ার সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম আরটিএস জানিয়েছে, সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ৪৯ জনকে ক্ষমা করেছেন ভুসিচ। তাদের মধ্যে ২৩ জন শিক্ষার্থী এবং তার দলের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন রয়েছেন। গত দেড় বছরে দেশ যে ‘ভয়াবহ পরিস্থিতির’ মধ্য দিয়ে গেছে, তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল।
এদিকে আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভুসিচের প্রগ্রেসিভ পার্টির মুখোমুখি হবে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ‘স্টুডেন্টস উইন’ এবং পশ্চিমাপন্থি বিরোধী দলগুলোর জোট ‘ইউরোপিয়ান সার্বিয়া’।
মূলত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সার্বিয়ার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন ভুসিচ। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি।
ভুসিচ প্রকাশ্যে সার্বিয়াকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য করার পক্ষে কথা বলেছেন। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন এবং চীনের বিনিয়োগের জন্য সার্বিয়ার অর্থনীতিকে আরও উন্মুক্ত করেছেন।




