
এ বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার কে পাচ্ছেন, তা নিয়ে তুমুল জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। নরওয়ের নোবেল কমিটি আগামী ৯ অক্টোবর অসলোতে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করবে।এ বছর পুরস্কারের জন্য মোট ২৮৭ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মনোনীত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০৮ জন ব্যক্তি এবং ৭৯টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
তবে নোবেল কমিটি সাধারণত মনোনয়ন পাওয়া ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ করে না। ফলে বিজয়ীর নাম আগেভাগে অনুমান করা অনেকটাই অনিশ্চিত। অতীতে কমিটি অনেক সময় এমন ব্যক্তিকেও পুরস্কার দিয়েছে, যাদের নাম ঘোষণার আগে খুব একটা আলোচনায় ছিল না।
আলোচনায় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন
এবারের সবচেয়ে চমকপ্রদ সম্ভাবনার একটি হলো আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বা আইএসএস। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নোবেল শান্তি পুরস্কারের পূর্বাভাসদাতাদের কেউ কেউ আইএসএসকে সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে দেখছেন।
শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউট অসলোর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হাকন গেরলভ এই সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তার মতে, বিভিন্ন দেশের মানুষ ও প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করার বিরল প্রতীক হলো আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন মহাকাশ স্টেশন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, নোবেল কমিটি সাধারণত এমন উদ্যোগ বিবেচনায় নেয়, যা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি তৈরি করে, দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে।
ট্রাম্পসহ আলোচনায় যারা
এবারের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। ট্রাম্প নিজেই একাধিকবার নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা তাকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা প্রকাশ্যে বলেছেন। তবে নোবেল কমিটি কোনো নির্দিষ্ট মনোনয়নের বিষয় নিশ্চিত করে না। এপি বলছে, ট্রাম্পের প্রার্থিতা বিতর্ক তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিষয়ক চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তার শান্তি পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। উপসালা কনফ্লিক্ট ডেটা প্রোগ্রামের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক শন ডেভিসও ট্রাম্পের জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
আলোচনায় রয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও।
চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও শুল্কসংক্রান্ত নানা বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থানের বিরুদ্ধে তুলনামূলক দৃঢ় অবস্থান নেওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কার্নি আলোচনায় এসেছেন।তবে কানাডার সাবেক অধ্যাপক নেলসন ওয়াইজম্যান মনে করেন, কার্নি পুরস্কার পেলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ক আরও খারাপ হতে পারে। তার মতে, পুরস্কার যেই পান না কেন, ট্রাম্প তাতে খুশি না-ও হতে পারেন।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রার্থীদের আলোচনায় ইউক্রেনের শিশু অধিকারকর্মী মাইকোলা কুলেবা এবং সেভ দ্য চিলড্রেনের নাম রয়েছে। সুদানের স্থানীয় ত্রাণ নেটওয়ার্ক ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস’ও রয়েছে আলোচনায়। যুদ্ধকবলিত সুদানে সাধারণ মানুষের জন্য জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজে যুক্ত এই নেটওয়ার্ক। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের নামও আলোচনায় এসেছে। গত দুই বছরে রেকর্ডসংখ্যক সাংবাদিক নিহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে সংগঠনটির নাম সামনে এসেছে।
আলোচনায় রয়েছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। দুই আদালতের নাম একসঙ্গে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে উঠে এসেছে। বিশেষ করে, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিভিন্ন দেশের নেতাদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের কারণে আইসিসি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় রয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে আইসিসির সমালোচনা করে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জুলাইয়ে আইসিসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এবার নোবেল শান্তি পুরস্কারে নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিয়েও আলোচনা রয়েছে। ১২৫ বছরের ইতিহাসে ১১২ জন নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। তাদের মধ্যে নারী মাত্র ২০ জন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। গত ১৫ বছরে ছয়জন পুরুষের বিপরীতে আটজন নারী এককভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৯৭ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী জোডি উইলিয়ামস আরও বেশি নারীকে পুরস্কৃত করার আশা প্রকাশ করেছেন।
এবার সম্ভাব্য নারী প্রার্থীদের মধ্যে গাজার সার্জন সারা আল-সাক্কা এবং রাশিয়ার বিরোধী রাজনীতিক ও প্রয়াত আলেক্সেই নাভালনির স্ত্রী ইউলিয়া নাভালনায়ার নাম রয়েছে।
যুদ্ধের মধ্যেই এবারের শান্তির পুরস্কার
এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কার এমন সময়ে দেওয়া হচ্ছে, যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাত বেড়েছে। সুদান, ইউক্রেন, ইয়েমেন, ইরানসহ পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এই পরিস্থিতিতে নোবেল কমিটি কাকে শান্তি পুরস্কার দেয়, সেটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তথ্যসূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস




