
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, ভাতাসহ সরকারি চাকরিতে সর্বনিম্ন বেতন হবে ৩৩ হাজার ২৫০ টাকা। আর গাড়িসুবিধা ছাড়া সর্বোচ্চ বেতন দাঁড়াবে প্রায় আড়াই লাখ টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ গত বৃহস্পতিবার ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ জারি করে। তবে প্রজ্ঞাপনটি প্রকাশিত হয় শনিবার। নতুন বেতনকাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে।
নতুন কাঠামোয় সরকারি চাকরির ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। আর সর্বোচ্চ নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবদের জন্য বিশেষ গ্রেড রাখা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের মূল বেতন ১ লাখ ৭২ হাজার এবং জ্যেষ্ঠ সচিবদের মূল বেতন ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সর্বনিম্ন বেতন ৩৩ হাজার ২৫০ টাকা
২০তম গ্রেডে মূল বেতন ২০ হাজার টাকার সঙ্গে সর্বনিম্ন হারে ৪৫ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতা যুক্ত হবে। এর সঙ্গে ৩ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা, ৬০০ টাকা যাতায়াত ভাতা, ৫০০ টাকা টিফিন ভাতা এবং ১৫০ টাকা মুঠোফোন ভাতা থাকবে।
সব মিলিয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ২০তম গ্রেডের একজন সরকারি কর্মচারীর সর্বনিম্ন মোট বেতন দাঁড়াবে ৩৩ হাজার ২৫০ টাকা। ঢাকায় বাড়িভাড়া ভাতা ৬০ শতাংশ হওয়ায় মোট বেতন দাঁড়াবে ৩৬ হাজার ২৫০ টাকা।
অন্যদিকে, ৯ম গ্রেডে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া কর্মকর্তাদের মূল বেতন হবে ৪৪ হাজার টাকা। এ গ্রেডে সর্বনিম্ন মোট বেতন হবে ৬০ হাজার টাকার কিছু বেশি।
সর্বোচ্চ বেতন ২ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা
বিশেষ গ্রেডে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। এর সঙ্গে ঢাকায় ৪০ শতাংশ বাড়িভাড়া, ৪ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা, ২ হাজার টাকা আপ্যায়ন ভাতা, ৫০০ টাকা মুঠোফোন ভাতা এবং ৩০০ টাকা ধোলাই ভাতা যুক্ত হবে।
সব মিলিয়ে তাঁদের মোট বেতন দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা। এর বাইরে সার্বক্ষণিক গাড়িসহ আরও কিছু সুবিধা রয়েছে।
তিন ধাপে বাড়বে মূল বেতন
নতুন বেতনকাঠামো ১ জুলাই থেকে কার্যকর হলেও সরকারি কর্মচারীরা ওই দিন থেকেই পুরো বর্ধিত মূল বেতন পাবেন না। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তিন ধাপে নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে।
২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বর্ধিত বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ পাবেন।
এরপর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডে বর্ধিত বেতনের ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে ৭৫ শতাংশ কার্যকর হবে। ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বেতন বৃদ্ধির শতভাগ কার্যকর হবে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে দুই দফায় মূল বেতনের ৭০ শতাংশ দেওয়ার জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জুলাই থেকে হিসাব করে বকেয়া অর্থ সেপ্টেম্বরের বেতনের সঙ্গে দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও তা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে বকেয়া পরিশোধ করা হবে।
পদোন্নতি না হলেও উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ
নতুন কাঠামোয় পদোন্নতি না পেলেও নির্দিষ্ট শর্তে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। একই পদে আট বছর চাকরি পূর্ণ করার পর চাকরির রেকর্ড সন্তোষজনক হলে নবম বছরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
এরপরও পদোন্নতি না হলে নির্ধারিত সময় পূর্ণ হওয়ার পর আরও একটি উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ থাকবে। তবে একই পদের বিপরীতে একাধিক উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা ও শর্ত রয়েছে। পদোন্নতির সুযোগ নেই—এমন ব্লকড পদে কর্মরত কর্মচারীরাও উচ্চতর গ্রেড পাবেন।
ইনক্রিমেন্ট হবে অর্থবছরের প্রথম দিনে
নতুন বেতনকাঠামোয় সরকারি কর্মচারীদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্টের তারিখ হবে অর্থবছরের প্রথম দিন। একটি ইনক্রিমেন্ট গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। তবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার ছয় মাস পূর্ণ না হলে ইনক্রিমেন্ট পাওয়া যাবে না।
সর্বোচ্চ পেনশন ৭০ হাজার ২০০ টাকা
অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনও বাড়ানো হয়েছে। পাঁচটি স্তরে পেনশন বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে। তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য বৃদ্ধির হার বেশি রাখা হয়েছে।
মাসে ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন ১০০ শতাংশ বাড়বে। ফলে ৯ হাজার টাকা পেনশন পাওয়া ব্যক্তি পাবেন ১৮ হাজার টাকা।
৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশনে ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশনে ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি হবে। তবে বর্তমানে ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ পেনশন হবে ৭০ হাজার ২০০ টাকা।
বাড়িভাড়া ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালে
নতুন বেতনকাঠামোয় কর্মস্থল ও গ্রেডভেদে বাড়িভাড়ার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নতুন হার কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। তার আগে প্রচলিত হারেই বাড়িভাড়া ভাতা দেওয়া হবে।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা মূল বেতনের ৬০ শতাংশ বাড়িভাড়া পাবেন। ১০ম থেকে ১৫তম গ্রেডে ৫০ শতাংশ, ৫ম থেকে ৯ম গ্রেডে ৪৫ শতাংশ এবং প্রথম থেকে চতুর্থ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডে ৪০ শতাংশ বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঢাকার বাইরে ১১টি সিটি করপোরেশন, সাভার ও কক্সবাজার পৌর এলাকায় ১৬তম থেকে ২০তম গ্রেডে ৫০ শতাংশ, ১০ম থেকে ১৫তম গ্রেডে ৪০ শতাংশ, ৫ম থেকে ৯ম গ্রেডে ৩৫ শতাংশ এবং প্রথম থেকে চতুর্থ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডে ৩০ শতাংশ বাড়িভাড়া দেওয়া হবে।
অন্যান্য এলাকায় ১৬তম থেকে ২০তম গ্রেডে ৪৫ শতাংশ, ১০ম থেকে ১৫তম গ্রেডে ৩৫ শতাংশ, ৫ম থেকে ৯ম গ্রেডে ৩০ শতাংশ এবং প্রথম থেকে চতুর্থ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডে ২৫ শতাংশ বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালে
নতুন কাঠামোর অধিকাংশ নতুন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত সরকারি কর্মচারীরা মাসে ৩ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা পাবেন। ৫০ বছর ১ দিন বয়স থেকে অবসর-উত্তর ছুটি শেষ হওয়া পর্যন্ত এ ভাতা হবে ৪ হাজার টাকা।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান থাকলে একজন সরকারি কর্মচারী সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য সন্তানপ্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। বাংলা নববর্ষ ভাতা হবে মূল বেতনের ১৫ শতাংশ, যা আগে ছিল ২০ শতাংশ।
চাকরিরত ও পেনশনভোগী—উভয়ের জন্য বছরে দুটি উৎসব ভাতা থাকবে। ২৩ বছর বয়স পর্যন্ত সন্তানপ্রতি মাসে ৫০০ টাকা শিক্ষাসহায়ক ভাতা দেওয়া হবে, সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য। ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা মাসে ৫০০ টাকা টিফিন ভাতা পাবেন।
সিটি করপোরেশন এলাকায় ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ৬০০ টাকা যাতায়াত ভাতা পাবেন। পঞ্চম গ্রেড ও তার ওপরে মোবাইল ভাতা ৫০০ টাকা এবং তার নিচের গ্রেডে ১৫০ টাকা করে দেওয়া হবে।
আপ্যায়ন ভাতা হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মাসে ২ হাজার টাকা, সিনিয়র সচিব ও সচিব ১ হাজার, অতিরিক্ত সচিব ৯০০ এবং যুগ্ম সচিব ও সমমর্যাদার কর্মচারীরা ৬০০ টাকা পাবেন।
এ ছাড়া পার্বত্য জেলায় কর্মরত কর্মচারীরা মূল বেতনের ২০ শতাংশ পাহাড়ি ভাতা পাবেন। জেলা সদর ও সদর উপজেলায় এ ভাতা সর্বোচ্চ ৫ হাজার এবং অন্যান্য উপজেলায় ৫ হাজার ৫০০ টাকা হবে। হাওর, দ্বীপ ও চর এলাকায় বিশেষ ভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশ হলেও তা ৫ হাজার টাকার বেশি হবে না।
সরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণে থাকা নবম গ্রেড ও তার ওপরের কর্মকর্তারা মূল বেতনের ২০ শতাংশ প্রশিক্ষণ ভাতা পাবেন। পাশাপাশি বিশেষায়িত হাসপাতাল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, কারাগার, ফায়ার সার্ভিস, বন বিভাগ ও ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারীদের ঝুঁকি ও বিশেষ ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের বেতন অনলাইনে নির্ধারণ করতে হবে। এ জন্য আইবাস প্লাস প্লাসের ‘পে ফিক্সেশন’ অপশনে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে। অনলাইনে আবেদন করতে জাতীয় পরিচয়পত্র, চাকরির তথ্য এবং আইবাস প্লাস প্লাসে নিবন্ধিত মুঠোফোন নম্বর প্রয়োজন হবে।




