
ইউরোপে আশ্রয়ের আশায় পাড়ি জমাচ্ছেন হাজারো বাংলাদেশি। গত এক দশকে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোতে বাংলাদেশিদের আশ্রয়ের আবেদন বেড়েছে ১৪৬ শতাংশ। কিন্তু আবেদন বাড়লেও আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশিদের আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার দাঁড়িয়েছে ৯৯ শতাংশে। ফলে ইউরোপে পৌঁছানোর পরও অধিকাংশ আবেদনকারীর অনিশ্চয়তা কাটছে না।
বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশি আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ৯০১-এ। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই আবেদন জমা পড়েছে ১৯ হাজার ৫২১টি।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (ইইউএএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশিদের আশ্রয়ের আবেদন ছিল ২০ হাজার ১১০টি। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ৭২৯টিতে। ২০২৩ সালে আবেদন জমা পড়ে ৪০ হাজার ৩৩২টি। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৪৩ হাজার ২৩৬টিতে পৌঁছায়, যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
২০২৫ সালে আবেদনের সংখ্যা কিছুটা কমলেও ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থীদের উৎস দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল চতুর্থ। ওই বছর ইইউ প্লাসভুক্ত দেশগুলোতে মোট আশ্রয়ের আবেদনের প্রায় ৪ শতাংশ ছিল বাংলাদেশিদের।
তবে আবেদন বাড়ার বিপরীতে প্রত্যাখ্যানের হারও উদ্বেগজনক। ২০১৬ সালে বাংলাদেশিদের আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার ছিল ৯৪ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথমার্ধে তা বেড়ে ৯৯ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ আশ্রয়ের আবেদন করেও স্বীকৃতি পাচ্ছেন খুবই কমসংখ্যক বাংলাদেশি।
ইতালি পছন্দের শীর্ষে
ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থী বাংলাদেশিদের পছন্দের দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ইতালি। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর বাংলাদেশিদের আবেদনের ক্ষেত্রে দেশটি প্রথম অবস্থানে ছিল। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ফ্রান্স। ২০২৫ সালে তৃতীয় অবস্থানে উঠে আসে গ্রিস।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, কৃষি খাতে আয় কমে যাওয়া, বৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার সুযোগের সংকট এবং মানব পাচারকারী চক্রের তৎপরতা অনিয়মিত অভিবাসনের অন্যতম কারণ। ইউরোপে পৌঁছাতে পারলেই আশ্রয় পাওয়া যাবে, এমন ধারণা ছড়িয়ে অনেককে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় প্রলুব্ধ করছে পাচারকারী চক্রগুলো।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম বলেন, দেশে কর্মসংস্থানের অভাব, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানব পাচারকারী চক্রের বিস্তারের কারণে অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। গ্রাম থেকে লিবিয়া হয়ে ইতালি পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক পাচারকারী নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে।
অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকাতে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের মতে, অনিয়মিত অভিবাসন ও আশ্রয়ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকাতে সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত নজরদারি বাড়ানো জরুরি। ভুয়া তথ্য ও নথি ব্যবহার করে আশ্রয়ের আবেদন করার প্রবণতা প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৬ সালের ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে টানা সপ্তম বছরের মতো ‘টিয়ার-২’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। মানব পাচার প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করার পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়া, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং অভিবাসী শ্রমিকদের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে ঘাটতির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানো, বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা বন্ধ করা এবং মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে আশ্রয়ের আবেদনসংক্রান্ত সঠিক তথ্য প্রচার করা প্রয়োজন, যাতে ভুল আশ্বাসে পড়ে কেউ জীবন বিপন্ন করে অনিশ্চিত পথে ইউরোপযাত্রা না করেন।




