
একটি ফোনকলের অপেক্ষা, প্রিয়জনের খোঁজে হাসপাতাল থেকে মর্গে ছুটে বেড়ানো, আর বুকের ভেতর জমে থাকা অজানা আশঙ্কা। কক্সবাজারের ইনানীতে রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে এমনই দুঃসহ সময় পার করছেন যশোরের মনিরামপুরের একটি পরিবারের সদস্যরা। নিখোঁজ নাহিদুর রহমান তুহিন, তার স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যা।
উদ্ধার হওয়া লাশগুলোর মধ্যে তাদের পরিবারের সদস্যরা রয়েছেন কি না, তা জানতে ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা দিয়েছেন স্বজনেরা। এখন শুধু ফলের অপেক্ষা, প্রিয়জনদের লাশ ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা।
মনিরামপুর পৌর শহরের মোহনপুর এলাকায় তুহিনের গ্রামের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। যে বাড়িতে প্রিয়জনদের ফিরে আসার অপেক্ষা থাকার কথা, সেখানে এখন স্বজনদের চোখে জল আর বুকভরা হাহাকার। তুহিনের বাবা মতিয়ার রহমানের কাছে ছেলের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতিই বারবার ফিরে আসছে। পরিবারের চার সদস্যের কোনো নিশ্চিত খবর না পাওয়ায় স্বজনদের কান্না যেন থামছেই না।
নিখোঁজ তুহিন মতিয়ার রহমানের ছোট ছেলে। তার বয়স ৪১ বছর। স্ত্রী আফসানা মতিন তানজির বয়স ৩৬ বছর। তাদের দুই মেয়ে রুজাইনা ইনায়া ও সুনাইনা ইহানার বয়স যথাক্রমে ছয় ও তিন বছর। চার সদস্যের পরিবারটি ঢাকার মোহাম্মদপুরের নুরজাহান রোডের একটি ভাড়া বাসায় থাকত। তুহিন ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে স্লিপার এসি কোচে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন তুহিন। শুক্রবার সকালে তারা উখিয়ার ইনানীতে সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন ইন্টুইট রিসোর্টের দ্বিতীয় তলার ২০২ নম্বর কক্ষে ওঠেন। শুক্রবার বিকেলে বাবার সঙ্গে শেষবার কথা হয় তুহিনের। জানিয়েছিলেন, রোববার দুপুরে রিসোর্ট থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন। কিন্তু সেই ফেরার অপেক্ষা এখন পরিণত হয়েছে অনিশ্চয়তা আর উৎকণ্ঠায়।
শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তুহিনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন স্বজনেরা। কিন্তু ফোনে সাড়া মেলেনি। এরপর শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। কখনো অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপে, কখনো হাসপাতালের মর্গে ছুটেছেন তারা। কিন্তু প্রিয়জনদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেননি কেউ।
তুহিনের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স জানান, আগুনে লাশগুলোর চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় সেগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। উদ্ধারকারীরা রিসোর্টের বাথরুম থেকে দুই শিশুসহ চারজনের লাশ উদ্ধারের কথা তাকে জানানো হয়েছে। এ কারণে লাশগুলো তুহিনের পরিবারের সদস্যদের হতে পারে বলে ধারণা করছেন তারা।
তুহিনের চাচাতো ভাই রিয়াজ আহমেদ জানান, উদ্ধার হওয়া লাশগুলো কক্সবাজার জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হবে।
রোববার বিকেলে তুহিনের বাবা এবং তার শ্বশুর-শাশুড়ি ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা ঢাকায় জমা দিয়েছেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। পরীক্ষার ফলের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর লাশ হস্তান্তরের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।
তুহিনের আরেক চাচাতো ভাই মোহাম্মদ খালিদও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। উখিয়ার পালংখালীতে কর্মরত খালিদের সঙ্গে শুক্রবার সকালে তুহিনের কথা হয়েছিল। সেই কথোপকথন এখন বারবার মনে পড়ছে তার।
খালিদ বলেন, ‘নাহিদুর ফোন দিয়ে বলেছিল, দেখা করবে। শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুনের ঘটনা শোনার পর যখন ওকে আবার ফোন দিলাম, ফোন আর ধরল না। তখনই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠছিল। কেমন জানি সন্দেহ লাগছিল।’
খালিদের কাছে তুহিনের সঙ্গে সেই শেষ কথোপকথন এখন এক বেদনাদায়ক স্মৃতি। পরিবারের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিত নন তিনি। লাশগুলোর পরিচয় শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
ঢাকা থেকে কক্সবাজারে ছুটে গেছেন ডলার মাহমুদও। তার চাচাতো বোনের মেয়ে তাজিন, তাজিনের স্বামী নাহিদুর রহমান এবং তাদের দুই সন্তান নিখোঁজ। খবর পাওয়ার পর থেকে রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপ ও হাসপাতালের মর্গে ছোটাছুটি করছেন তিনি।
ডলার মাহমুদ বলেন, ‘চাচাতো বোনের কাছেই বড় হয়েছি আমি, তাই এই বিপদে সবচেয়ে বেশি দায়িত্বটা আমারই। খবর পাওয়ার পর থেকে স্থির থাকতে পারিনি। পোড়া রিসোর্টে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে খুঁজেছি, এখন মর্গে আইনি জটিলতা মেটানোর চেষ্টা করছি।’
উদ্ধার হওয়া চারটি লাশ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘জড়াজড়ি করে শৌচাগার থেকে যে চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আমাদের ধারণা, তারাই নাহিদুরের পরিবারের সদস্য।’
তবে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।




