
একটি পুরনো সড়ক, কিছু পাখির ডাক, পুবালী বাতাস আর বেঙ্গল গ্যালারির এক কাপ চা—কখনো কখনো একটি সম্পর্কের পুরো ইতিহাস লুকিয়ে থাকে সামান্য কিছু স্মৃতির ভেতর। মানুষ চলে যায়, শহর বদলায়, রাস্তার চেহারা পাল্টে যায়; কিন্তু কিছু বিকেল থেকে যায় ঠিক আগের মতো। সেইসব বিকেলের কাছে ফিরে গিয়ে আজও কেউ হয়তো নিঃশব্দে বলে—আজ তোমাকে ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে, ‘তোমার কি একটু সময় হবে?’
কিছু ইচ্ছের কোনো যুক্তি থাকে না। থাকে না কোনো বিশেষ উপলক্ষও। তারা হঠাৎ এসে দরজায় দাঁড়ায়। একেবারে বিনা নোটিশে।
কোনো এক বৃহস্পতিবারের বিকেলে, জানালার পাশে বসে থাকতে থাকতে হয়তো মনে হলো—আজ তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
‘খুব’ শব্দটাও যেন যথেষ্ট নয়। ভীষণ। ভীষণ ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে। কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষ অনেক দূর চলে যেতে পারে। স্মৃতির অলিগলি পেরিয়ে, পুরনো দিনের ভাঁজ খুলে, ভুলে যাওয়া কোনো বিকেলের দরজায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়তো কোনো উত্তরই পাওয়া যায় না। শুধু মনে হয়, কিছু মানুষকে দেখার ইচ্ছা আসলে মানুষটিকে দেখার ইচ্ছা নয়; তার সঙ্গে কাটানো সময়টুকুকে আরেকবার ছুঁয়ে দেখার আকাঙ্ক্ষা।
তাই আজ শুধু একটা প্রশ্ন—তোমার কি একটু সময় হবে? অনেকটা সময় নয়। পুরো একটি দিনও নয়। হয়তো এক বিকেল। কিংবা তারও কম। শুধু দেখা হবে। কোনো হিসাবের খাতা খুলব না। পুরনো অভিমানগুলো গুনব না। কে কাকে কতটা কষ্ট দিয়েছিল, কে আগে দূরে সরে গিয়েছিল—সেসব নিয়ে কোনো বিচারসভাও বসবে না। শুধু দেখা হবে। ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে একদিন আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল। পুরনো সেই সড়কটি কি তোমার মনে আছে? সময়ের সঙ্গে শহরের অনেক রাস্তা বদলে যায়। কোথাও নতুন ভবন ওঠে, কোথাও ফুটপাত চওড়া হয়, কোথাও পুরনো গাছ কেটে তৈরি হয় নতুন পথ। তবু মানুষের স্মৃতির ভেতরের রাস্তা বদলায় না। সেই রাস্তাটিও হয়তো আজ আর আগের মতো নেই। কিন্তু স্মৃতিতে? সেখানে এখনো পাখিরা ডাকে। কিচিরমিচির শব্দে ভরে থাকে চারপাশ। পুবালী বাতাস এসে অকারণে ছুঁয়ে যায় মুখ। আর সেই বাতাসে কোথা থেকে যেন ভেসে আসে তোমার চুলের ঘ্রাণ। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মানুষের স্মৃতি চোখের চেয়ে নাক আর কানকে অনেক বেশি বিশ্বাস করে। একটি গন্ধ, একটি গান, একটি শব্দ—হঠাৎ বহু বছর আগের কোনো দুপুরকে বর্তমানের ঘরে এনে বসিয়ে দিতে পারে। তোমার চুলের সেই ঘ্রাণও হয়তো তেমনই একটি স্মৃতি। আর তোমার হাত? সেই সামান্য উষ্ণ পরশটুকু কি মনে আছে? হয়তো তোমার কাছে সেটি ছিল একেবারেই স্বাভাবিক একটি মুহূর্ত। হয়তো হাত ছুঁয়ে যাওয়ার সেই ক্ষণটিকে তুমি আলাদা করে মনে রাখোনি। কিন্তু কিছু স্পর্শ মানুষের জীবনে অদ্ভুতভাবে থেকে যায়। সময় তাকে মুছে দিতে পারে না। বরং সময় যত যায়, সেই স্পর্শের অর্থ যেন তত বাড়তে থাকে।
শহরের ভেতর একটি বিকেল: শহর আসলে মানুষের স্মৃতির সবচেয়ে বড় ভাণ্ডার। একটি মোড় মানে কারও কাছে অফিসে যাওয়ার পথ, অন্য কারও কাছে প্রথম দেখা। কোনো রেস্তোরাঁ কারও কাছে নিছক খাবারের জায়গা, আবার কারও কাছে সেখানে রেখে আসা একটি সম্পর্কের শেষ অধ্যায়। তেমনই বেঙ্গল গ্যালারি। তোমার কি বেঙ্গল গ্যালারির কথা মনে আছে? সেখানে আমরা কত বই দেখেছি! বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়িয়ে কতবার যে সময়ের কথা ভুলে গেছি, তার হিসাব নেই। তুমি কোনো বই হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতে, আমি হয়তো তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। কোনো কোনো বই কেনা হতো, কোনো কোনো বই শুধু দেখা হতো। কিন্তু বইয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠত আমাদের গল্প। বইয়ের পাতায় লেখা গল্প শেষ হয়ে যেত। আমাদের গল্প শেষ হতো না। চা আসত। এক কাপ, দুই কাপ। তারপর আরও কত কিছু। খাবারের তালিকা হয়তো আজ আর মনে নেই। মনে নেই কোন দিনে কী খেয়েছিলাম। কিন্তু মনে আছে পাশাপাশি বসে থাকার সেই অনুভূতিটুকু।
মানুষ বোধহয় খাবারের স্বাদ ভুলে যায়, কিন্তু কার সঙ্গে বসে খেয়েছিল—সেটা ভুলতে পারে না। আজ এতদিন পরও বেঙ্গল গ্যালারির নাম শুনলে হয়তো কোনো বইয়ের প্রচ্ছদ মনে পড়ে না। মনে পড়ে তোমাকে। মনে পড়ে তোমার কথা বলার ভঙ্গি। মনে পড়ে চায়ের কাপের ওপর দিয়ে তাকানো চোখ। মনে পড়ে, কোনো একটা কথা শুনে তোমার হেসে ওঠা। এবং মনে পড়ে—সেদিন সময় কত দ্রুত চলে গিয়েছিল।
কিছু সম্পর্কের কোনো নাম থাকে না: জীবনে এমন কিছু সম্পর্ক আসে, যাদের পরিচয় নির্ধারণ করা কঠিন। তাদের বন্ধু বলা যায়, আবার শুধু বন্ধু বললেও যেন কম বলা হয়। ভালোবাসা বলা যায়, আবার ভালোবাসার প্রচলিত সংজ্ঞায় তাদের আটকে রাখা যায় না।
কিছু সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর দিক হয়তো এটাই—তাদের কোনো নামের প্রয়োজন হয় না। তারা থাকে। একসঙ্গে হাঁটায়, চায়ের টেবিলে বসায়, বইয়ের দোকানে নিয়ে যায়, বিকেলের আলোয় দাঁড় করায়। তারপর কোনো একদিন হঠাৎ দূরত্ব এসে মাঝখানে বসে পড়ে। মানুষ ভাবে, পরে কথা হবে। পরে দেখা হবে। পরে অনেক কথা বলা যাবে। কিন্তু সেই ‘পরে’ কখনো কখনো আর আসে না। জীবন তার নিজের গতিতে এগিয়ে যায়। ব্যস্ততা বাড়ে। ফোনবুক বদলায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত মানুষের সংখ্যা বাড়ে, অথচ পরিচিত মুখের ভিড়ে কোনো একজনের অনুপস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখনই হয়তো মনে হয়— একবার যদি দেখা হতো! শুধু একবার।
ফিরে আসার কোনো বয়স নেই: আমরা বড় হতে হতে একটা ভুল শিখে ফেলি—ভাবি, অতীত মানেই শেষ হয়ে যাওয়া। আসলে তা নয়। অতীত কখনো শেষ হয় না। আমরা শুধু তার দরজা বন্ধ করে রাখি। কোনো একদিন পুরনো কোনো গান সেই দরজা খুলে দেয়। কোনো পুরনো বই, কোনো পরিচিত গন্ধ, কোনো রাস্তা কিংবা কোনো একটি নাম দরজায় কড়া নাড়ে। তখন মনে হয়, এতদিন পরও মানুষটি কেন এত কাছে? কেন এখনো মনে হয়, সে যদি সামনে এসে দাঁড়ায়, কথা শুরু করতে খুব বেশি সময় লাগবে না? হয়তো প্রথমে দুজনেই চুপ থাকবে। তারপর কেউ একজন বলবে— ‘কেমন আছ?’ এই দুটি শব্দের মধ্যেই কখনো কখনো বছরের পর বছর জমে থাকা গল্প লুকিয়ে থাকে।
আজ শুধু দেখা করতে ইচ্ছে করছে: আজ তাই কোনো অভিযোগ নেই। কোনো প্রত্যাশাও নেই। তোমাকে ফিরে পেতে চাই—এমন দাবিও নেই। শুধু দেখতে ইচ্ছে করছে।দেখতে ইচ্ছে করছে, সময় তোমাকে কতটা বদলেছে। জানতে ইচ্ছে করছে, তুমি এখনো বইয়ের পাতায় হারিয়ে যাও কি না। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে আগের মতো দীর্ঘ গল্প করো কি না। পুবালী বাতাসে চুল এলোমেলো হলে বিরক্ত হও কি না। আর সবচেয়ে বেশি জানতে ইচ্ছে করছে—তোমারও কি কখনো সেই পুরনো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে? হয়তো পড়ে। হয়তো পড়ে না। তার উত্তর জানার জন্যও কোনো তাড়া নেই। তবু যদি কোনো একদিন সময় হয়, এসো। ঠিক সেই পুরনো সড়কে। যদি রাস্তা বদলে গিয়ে থাকে, তবু সমস্যা নেই। আমরা স্মৃতির রাস্তা ধরে হাঁটব। পাখিরা যদি আগের মতো না ডাকে, তবু সমস্যা নেই। আমরা নিজেদের নীরবতা শুনব। পুবালী বাতাস যদি আর তোমার চুলের গন্ধ না বয়ে আনে, তবু কিছু যায় আসে না। কারণ কিছু গন্ধ সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না। তারপর চাইলে বেঙ্গল গ্যালারিতে যাওয়া যাবে। আবার বই দেখা যাবে।কোনো একটা বই হয়তো তুমি হাতে তুলে নেবে। আমি হয়তো জিজ্ঞেস করব—‘কিনবে?’ তুমি হয়তো হাসবে। তারপর এক কাপ চা। হয়তো এবার কথার চেয়ে নীরবতা বেশি হবে। হয়তো আমাদের দুজনের জীবনেই এমন অনেক অধ্যায় এসেছে, যেগুলো একে অপরকে বলা হয়ে ওঠেনি। হয়তো আমরা দুজনেই বদলে গেছি। হয়তো আগের সেই মানুষ দুজন আর নেই। তবু একটি বিকেল তো ধার করা যায়। অতীত থেকে নয়—বর্তমান থেকে। শুধু একবার পাশাপাশি বসার জন্য।
স্মৃতিরও কি কোনো ঠিকানা থাকে? থাকে। একটি পুরনো সড়ক। একটি বইয়ের তাক। একটি চায়ের কাপ। কোনো এক বিকেলের পুবালী বাতাস। আর একজন মানুষ, যাকে অনেক দিন দেখা হয়নি। আমাদের জীবন যত আধুনিক হচ্ছে, যোগাযোগের মাধ্যম তত বাড়ছে। এক মুহূর্তে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে কথা বলা যায়। ছবি পাঠানো যায়, ভিডিও কলে মুখ দেখা যায়, পুরনো স্মৃতি কয়েক সেকেন্ডে ফিরে আসে। তবুও দেখা করার আকাঙ্ক্ষা কমে না। কারণ স্ক্রিনে মানুষকে দেখা যায়, কিন্তু তার পাশে বসা যায় না। একটি ছবিতে হাসি দেখা যায়, কিন্তু সেই হাসির শব্দ শোনা যায় না। ভিডিও কলে মুখ দেখা যায়, কিন্তু হাতের উষ্ণতা অনুভব করা যায় না। তাই হয়তো আজও কোনো এক মানুষ অন্য একজনকে লিখতে চায়— ‘আজ তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।’ তারপর নিজেই থেমে যায়। বার্তাটি পাঠাবে কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় থাকে। কারণ কিছু অনুভূতি বলা হয়ে গেলে ছোট হয়ে যায়। না বললে তারা নিজের ভেতরেই একটি পূর্ণ পৃথিবী হয়ে থাকে।
শেষ পর্যন্ত যা থেকে যায়: জীবনের সব সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে থাকে না। কেউ দূরে চলে যায়। কেউ অন্য শহরে, অন্য জীবনে। কেউ যোগাযোগের বাইরে চলে যায়। কেউ আবার খুব কাছে থেকেও অচেনা হয়ে যায়। কিন্তু স্মৃতি? স্মৃতি কোনো পাসপোর্ট চায় না। কোনো ভিসা লাগে না। সে যখন-তখন ফিরে আসতে পারে। একটি পুরনো বিকেলের মতো। একটি পাখির ডাকের মতো। একটি চায়ের কাপের মতো। অথবা তোমার মতো।
তাই আজও মনে হয়, যদি কখনো তোমার হাতে একটু সময় থাকে, এসো। কোনো বড় আয়োজন নয়। কোনো প্রতিশ্রুতি নয়। কোনো পুরনো সম্পর্ককে নতুন নামে ডাকার চেষ্টাও নয়। শুধু দেখা হবে। হয়তো কয়েক মিনিট। হয়তো একটি বিকেল। হয়তো শুধু এক কাপ চা। আর সেই পুরনো সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে মনে হবে—সময় আসলে আমাদের এতটা দূরে নিয়ে যেতে পারেনি। কারণ কিছু মানুষ দূরে চলে গেলেও তাদের জন্য মনের ভেতর একটি দরজা খোলা থাকে। সেই দরজার ওপাশে এখনো পাখিরা ডাকে। পুবালী বাতাস বয়ে যায়। একটি পুরনো শহর নিঃশব্দে অপেক্ষা করে। আর কেউ একজন খুব আস্তে বলে— ‘আজ তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। খুব বললে ভুল হবে— ভীষণ ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে। তোমার কি একটু সময় হবে?’




