
ভিকারুন্নিসা অ্যালামনাই অস্ট্রেলিয়া (ভিএঅস) একটি অলাভজনক সংগঠন, যা অস্ট্রেলিয়ার আটটি প্রাদেশিক অঞ্চলে বসবাসরত প্রবাসী কমিউনিটির জন্য বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্কুলজীবনের বন্ধনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সংগঠনটি সময়ের সঙ্গে নারীর ক্ষমতায়ন, শিশুদের সহায়তা, স্বাস্থ্যসুরক্ষা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের পরিধি বাড়িয়েছে।
ছোটবেলায় সবাই বড় হওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত। কিন্তু স্কুলের শেষ দিনটি যতই এগিয়ে আসত, সেই উত্তেজনা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যেত। বছরের পর বছর একই শ্রেণিকক্ষ, করিডোর, খেলার মাঠ, হাসি-ঠাট্টা ও ছোট ছোট মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়ার পর প্রত্যেকে যখন ভিন্ন পথে পা বাড়াত, তখন সবকিছুই মুহূর্তে স্মৃতিতে পরিণত হতো। থেকে যেত একটি প্রশ্ন—চেনা মুখগুলোর সঙ্গে আবার কবে দেখা হবে?
ভিকারুন্নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একই শ্রেণিকক্ষে পড়া প্রাক্তনীদের বন্ধুত্ব অবশ্য সেখানেই থেমে থাকেনি। অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে বসবাস করেও সেই বন্ধন তাদের একসঙ্গে রেখেছিল। ২০১৬ সালের অক্টোবরে সিডনির একটি রেস্তোরাঁয় বসে কয়েকজন প্রাক্তনী আবার একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেই ছোট উদ্যোগই ধীরে ধীরে ‘ভিকারুন্নিসা অ্যালামনাই অস্ট্রেলিয়া’ বা ভিএঅসে রূপ নেয়।
সংগঠনটি ২০১৭ সালের মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ২০২২ সালে এটি একটি দাতব্য সংস্থা হিসেবে নিবন্ধিত হয়। সময়ের সঙ্গে সংগঠনটির কার্যক্রম অস্ট্রেলিয়ার আটটি প্রাদেশিক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। তখনই তাদের সামনে আসে নতুন একটি প্রশ্ন—‘আমরা অন্যদের জন্য কী করতে পারি?’
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নিজেদের গণ্ডির বাইরে তাকাতে শুরু করেন প্রাক্তনীরা। আশপাশের মানুষ কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, সেদিকেও নজর দেন তারা। প্রথম যে বিষয়টি তাদের বেশি ভাবায়, তা হলো ডমেস্টিক ভায়োলেন্স বা পারিবারিক সহিংসতা।
বিদেশে বসবাস করলে অনেক সময় মনে হতে পারে, নারীদের হয়তো তেমন কোনো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিভিন্ন প্রতিবেদনে নারীদের ওপর ডমেস্টিক ভায়োলেন্স বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। তবে ভিএঅসের প্রাক্তনীদের কাছে বিষয়টি শুধু খবর ছিল না। তাদেরই এক সহপাঠী গর্ভবতী অবস্থায় বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য হলে বিষয়টি আরও কাছের হয়ে ওঠে। তার কথা জানার পর সদস্যরা মিলে তাকে সহায়তার জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন।
তবে তাকে এবং আরও অনেককে সহায়তা করতে গিয়ে প্রাক্তনীরা বুঝতে পারেন, তাৎক্ষণিক সাহায্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিই পুরো সমাধান নয়। ভিএঅসের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও অ্যাডভাইজার ড. সুরঞ্জনা জেনিফার রহমান প্রশ্ন তোলেন, ‘আমরা শুধু ভিকটিমদের সাহায্য করছি। কিন্তু এটাই কি যথেষ্ট? যারা এই শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ, তাদের নিয়ে কী করব?’
তার মতে, সহিংসতার শিকার নারীদের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি এমন পরিস্থিতি শুরুতেই কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় ‘চেঞ্জ দ্য স্টোরি: মেন অ্যাজ চ্যাম্পিয়নস’ উদ্যোগ। এর মাধ্যমে পুরুষদের ডমেস্টিক ভায়োলেন্স নিয়ে খোলামেলা কথা বলা, এর প্রভাব বোঝা এবং নিরাপদ সমাজ গঠনে পুরুষরা কী ভূমিকা রাখতে পারেন—এসব বিষয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি করা হয়।
তবে শুধু নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। যারা এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন, তাদের নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ দেওয়াও জরুরি। এই ভাবনা থেকেই তৈরি হয় ‘হার বিজনেস’ উদ্যোগ। নতুন করে অস্ট্রেলিয়ায় আসা এবং ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার নারীদের দক্ষতা অর্জন ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করে এই উদ্যোগ।
ভিএঅসের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও অ্যাডভাইজার ড. মাহবুবা খানম মুক্তা বলেন, ‘নারীদের নিজেদের স্বাবলম্বী হতে এবং একটি ভালো ভবিষ্যৎ গড়তে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস থাকা জরুরি।’
আটটি ওয়ার্কশপের মাধ্যমে ১২ জন নারী সেলাই ও হোম বিজনেসের মতো কাজে প্রশিক্ষণ নেন। বর্তমানে তারা সবাই কর্মরত আছেন। এ ছাড়া ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার নারীদের আশ্রয়কেন্দ্রের বিভিন্ন সুবিধা উন্নয়নের জন্য ভিএঅসের প্রাক্তনীরা ৬ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার সংগ্রহ করেন। নারীদের নতুন করে জীবন গড়ার পথেও এটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে কাজ করেছে।
কাজ এগিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাক্তনীরা বুঝতে শুরু করেন, সাহায্যের প্রয়োজন সব সময় বড় কোনো সমস্যা ঘিরে হয় না। অনেক সময় ছোট ছোট দৈনন্দিন প্রয়োজনও মানুষের জীবনে বড় প্রভাব ফেলে। এর মধ্যে অন্যতম মাসিককালীন স্বাস্থ্যবিধি। মাসিক নারীজীবনের স্বাভাবিক একটি অংশ হলেও আর্থিক সমস্যায় থাকা নারী ও মেয়েরা সব সময় প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে পারেন না।
ভিএঅসের জেনারেল সেক্রেটারি রিফায়াত রোনাক ইকো বলেন, ‘মাসিককালীন সামগ্রী একটি মৌলিক প্রয়োজন। কোনো নারীর তা কেনার সামর্থ্য নেই বলে তার স্বাস্থ্যবিধির সঙ্গে আপস করতে হবে না।’
এই ভাবনা থেকেই ভিএঅস ‘শেয়ার দ্য ডিগনিটি’ উদ্যোগকে সমর্থন করে। এর মাধ্যমে স্কুল, পাবলিক টয়লেট ও কেয়ার হ্যাম্পারের মাধ্যমে নারীদের মাসিককালীন সামগ্রী সরবরাহের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হয়।
মৌলিক চাহিদার বিষয়টি শিশুদের ক্ষেত্রেও গুরুত্ব পায়। এ ভাবনা থেকেই শুরু হয় ‘ইট আপ’ উদ্যোগ। পরিবারের আর্থিক সমস্যার কারণে যেসব শিশু দুপুরের খাবার নিয়ে স্কুলে যেতে পারে না, তাদের জন্য টিফিনের ব্যবস্থা করাই ছিল এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
ভিএঅসের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘আমরা অনুভব করলাম, কোনো শিশু যেন ক্ষুধার্ত অবস্থায় স্কুলে না যায়, তা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের কিছু একটা করতে হবে।’
২০২৪ সালের মার্চে ভিএঅস একটি ‘মর্নিং টি’ আয়োজন করে ২ হাজার ৫০০ অস্ট্রেলীয় ডলার সংগ্রহ করে। পরে ২০ জন স্বেচ্ছাসেবক মাত্র ৮০ মিনিটে দুটি সরকারি স্কুলের জন্য ১ হাজার ৮৭টি স্যান্ডউইচ তৈরি করেন। সেগুলো সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
বছরের পর বছর নারী ও শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর পর প্রাক্তনীরা এবার তাদের বেড়ে ওঠার দেশ বাংলাদেশ নিয়েও ভাবতে শুরু করেন। যে বন্ধন তাদের একসঙ্গে রেখেছে, সেই বন্ধন বাংলাদেশের মানুষের জন্যও কাজে লাগানো যায় কি না—বিশেষ করে সুযোগ থেকে বঞ্চিত মানুষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করা যায় কি না—তা নিয়ে ভাবেন তারা।
এই ভাবনা নতুন রূপ পায় যখন ভিএঅসের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মারিয়াম শামস ‘মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া’ সিজন ১৩-এর দ্বিতীয় রানারআপ কিশোয়ার চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিশোয়ারেরও একই ধরনের একটি ভাবনা ছিল। ওয়ার্ল্ড ভিশন অস্ট্রেলিয়ার অ্যাম্বাসেডর হিসেবে তিনি করাইল বস্তি সফর করেছিলেন। সেখানে শিশুরা তাকে প্রশ্ন করেছিল, ‘আমরা কি আপনার মতো হতে পারি?’
শিশুদের সেই প্রশ্ন মারিয়ামের মনে দাগ কাটে। সীমিত সুযোগ কীভাবে তরুণদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে, তা তাকে ভাবায়।
মারিয়াম বলেন, ‘আমরা আমাদের বাংলাদেশি কিশোর-তরুণদের কাছে পৌঁছাতে এবং তাদের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলাম, এমনকি যদি তা পরোক্ষভাবেও হয়।’
এই ভাবনা থেকেই ভিএঅস ‘কেসিসি উইংস’কে ৫ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার অনুদান দেয়। এই অর্থ করাইলের ১০ জন তরুণকে কুলিনারি প্রশিক্ষণ, পরামর্শ, ইংরেজি শিক্ষা এবং কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত হতে সহায়তা করে।
এই উদ্যোগের কথা বলতে গিয়ে মারিয়াম বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, স্কুলের সম্পর্ক ছাড়িয়ে কমিউনিটিকে বদলে দেওয়ার যে স্বপ্ন নিয়ে আমরা ভিএঅস শুরু করেছিলাম, তা আমাদের কাজের মাধ্যমে এবং আমরা যাদের সাহায্য করেছি, তাদের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকবে।’
বাংলাদেশের সঙ্গে ভিএঅসের এই সংযোগ এখানেই শেষ নয়। ২০২৪ সালে বন্যাদুর্গত এলাকায় এবং ২০২৫ সালে এইম স্কুল ফাউন্ডেশনের শিক্ষার্থীদের জন্য বেঞ্চ সরবরাহে সহায়তা করে সংগঠনটি। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভিএঅস এইম ফাউন্ডেশনের ‘স্পনসর এ চাইল্ড’ প্রকল্পে সহায়তা করছে। এর মাধ্যমে শিশুদের বই, কলম, পেন্সিলসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী দেওয়া হচ্ছে।
সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ভিএঅস অস্ট্রেলিয়ার কমিউনিটিতে ৯২ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার অনুদান সংগ্রহ করেছে। এই অর্থ ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার নারীদের শারীরিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সহায়তা, নারীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা, কর্মসংস্থান এবং আর্থিক ক্ষমতায়নের বিভিন্ন উদ্যোগে ব্যয় হয়েছে।
তাৎক্ষণিক সহায়তা থেকে শুরু করে শিক্ষা, দক্ষতা ও নতুন সুযোগ তৈরি করা পর্যন্ত ভিএঅসের কাজ ধীরে ধীরে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে। এর পেছনে রয়েছে সেই একই বন্ধন, যা একসময় স্কুলের কয়েকজন বন্ধু, সিনিয়র ও জুনিয়রকে আবার একসঙ্গে করেছিল।
প্রাক্তনীদের সঙ্গে আবার যোগাযোগের ছোট্ট একটি উদ্যোগ থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ একটি বড় কমিউনিটিতে পরিণত হয়েছে। সিডনির একটি ছোট রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়ার আটটি অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা একটি দাতব্য সংগঠনে পরিণত হওয়ার এই গল্প শুধু একটি সংগঠনের বড় হয়ে ওঠার গল্প নয়; এটি স্কুলজীবনে তৈরি হওয়া বন্ধন ও সহমর্মিতা সময়ের সঙ্গে কীভাবে বহু মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারে, তারও একটি উদাহরণ।




