
সংযুক্ত আরব আমিরাতপ্রবাসী সাংবাদিক ও রেমিট্যান্সযোদ্ধা নওশের আলম চৌধুরী ওরফে সুমনকে একটি মাদকসিন্ডিকেটের পক্ষ থেকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দেশে ফিরলে তাঁকে ‘কচুকাটা করে হত্যা’ এবং লাশ গুমের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁর স্বজনেরা। এ ঘটনায় উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে বিভিন্ন সামাজিক, সাংবাদিক, পেশাজীবী ও প্রবাসী সংগঠন। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে হুমকির নেপথ্যে থাকা ব্যক্তি ও চক্রকে শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনগুলো।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন প্রবাসী সাংবাদিককে ভয়ভীতি বা প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, প্রবাসী সমাজের স্বার্থ এবং সাধারণ মানুষের তথ্য জানার অধিকারও জড়িত। বিশেষ করে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রবাসী ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
জানা যায়, নওশের আলম চৌধুরী ওরফে সুমন ১৯৯২ সালে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে রংপুর সদর উপজেলার ২ নম্বর হরিদেবপুর ইউনিয়নের পাগলাপীর মহাদেবপুর পশ্চিম পাড়ায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নওশের সুমনসহ কয়েকটি পরিবার এসে জমি কিনে বাড়ি করে বসবাস শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় সেখানে নতুন একটি পাড়া গড়ে ওঠে। ছোটবেলা থেকেই নওশের সুমনের লেখালেখির প্রতি আগ্রহ ছিল। সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন তিনি। ইতোমধ্যে তাঁর বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ ও গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
পরবর্তীতে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন নওশের আলম সুমন। লেখালেখির অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সংবাদমাধ্যমে সক্রিয় হওয়ার পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন সমস্যা, অধিকার, সম্ভাবনা ও জীবনযাত্রার বাস্তবতা নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। জীবিকার তাগিদে ২০১৫ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাড়ি জমান নওশের সুমন। এরপর থেকে দেশটিতে বসবাস করে জীবিকার পাশাপাশি সাংবাদিকতা এবং প্রবাসী কল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের কর্মক্ষেত্রের সমস্যা, দেশটির আইন-কানুন, দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়ন, বৈধ পথে দেশে রেমিট্যান্স প্রেরণ, ভিসা ও অভিবাসনসংক্রান্ত বিষয়, বিভিন্ন সংকট, সম্ভাবনা এবং প্রবাসজীবনের নানা বাস্তবতা নিয়ে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ করে আসছেন তিনি। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর প্রতিবেদনে প্রবাসীদের জীবনযাত্রা, সামাজিক সমস্যা, আইন-কানুন, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি এবং বাংলাদেশ-সংযুক্ত আরব আমিরাতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে।
এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা গণমাধ্যমে তুলে ধরার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং আইনসম্মত সমাধানের পথ খুঁজে বের করার ক্ষেত্রেও নওশের আলম সুমন সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
এদিকে, সাংবাদিকতার পেশাগত জীবনে নওশের আলম সুমন দেশের বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমের সঙ্গে কাজ করেছেন। বাংলাদেশ জার্নাল, সাম্প্রতিক দেশকাল, প্রতিদিনের সংবাদ, দৈনিক যায়যায়দিন, বাংলাদেশ বুলেটিন ও গ্লোবাল টেলিভিশনসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে তাঁর পেশাগত সম্পৃক্ততা রয়েছে।
অন্যদিকে, প্রবাসে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি বৈধ পথে দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর গুরুত্ব নিয়েও কাজ করে আসছেন নওশের সুমন। প্রবাসীদের বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করা, দেশের অর্থনীতিতে তাঁদের অবদান তুলে ধরা এবং প্রবাসজীবনের নানা বাস্তবতা নিয়ে লেখালেখি তাঁর কর্মকাণ্ডের অন্যতম অংশ বলে জানা গেছে।
এদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিভিন্ন মানবিক, সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার পাশাপাশি দেশটির আইন-কানুন মেনে চলা ও অন্যদের উৎসাহিত করা এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রেরণে ভূমিকা রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ডসহ বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন নওশের আলম চৌধুরী ওরফে সুমন। এ ছাড়া দেশে-বিদেশে পেশাগতসহ বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক সংগঠনের পক্ষ থেকেও তিনি পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।
এ ছাড়া, প্রবাসী বাংলাদেশিদের সমস্যা নিয়ে কাজের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার বিষয়েও সংবাদ ও লেখালেখির মাধ্যমে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন সুমন। তবে এমন পেশাগত কর্মকাণ্ডের মধ্যেই নওশের আলম সুমনকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, দেশে ফিরলে তাঁকে ‘কচুকাটা করে হত্যা’ এবং লাশ গুম করার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ কারণে তিনি দেশে ফিরতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, রংপুর সদর উপজেলার পাগলাপীর মহাদেবপুর পশ্চিম পাড়ায় নতুন করে গড়ে ওঠা এলাকায় একটি ওয়াক্তিয়া মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার পর জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, মসজিদ নির্মাণে বাধা, জমি জবরদখলের চেষ্টা ও চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে দুবাইপ্রবাসী নওশের সুমনের সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিরোধের সূত্রপাত হয়। এর জেরে তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নওশের সুমন ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবার মিথ্যা মামলা, হয়রানি ও হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ঘটনায় বিভিন্ন সামাজিক, সাংবাদিক, পেশাজীবী ও প্রবাসী সংগঠনের নেতারা উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ জার্নালিস্ট ফোরামের সভাপতি ও সময় টেলিভিশনের আমিরাত প্রতিনিধি শিবলী আল সাদিক বলেন, প্রবাসী সাংবাদিকরা বিদেশের মাটিতে থেকেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন সমস্যা, অধিকার ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে ও সামাজিকভাবে কোনঠাসা করে পেশাগত দায়িত্ব পালনে ভয়ভীতি বা প্রাণনাশের হুমকি সৃষ্টি করা হলে তা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় থাকে না; এর প্রভাব পড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীন পরিবেশ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থের ওপরও।
বাংলাদেশ প্রবাস ক্লাব ইউএইর সভাপতি মুহাম্মদ ফয়েজুল্লাহ শহীদ বলেন, দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। বিদেশের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করে বৈধ পথে দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর পাশাপাশি অনেক প্রবাসী বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত থাকেন। ফলে তাঁদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার বিষয়টি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
একই সঙ্গে সংগঠনগুলোর নেতারা অভিযোগটি দ্রুত তদন্ত করে হুমকিদাতাদের শনাক্ত করার পাশাপাশি নেপথ্যে কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সম্পৃক্ততা থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি নওশের আলম সুমন ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছেন তাঁরা।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, নওশের আলম সুমনের মতো যারা প্রবাসী বাংলাদেশিদের সমস্যা, অধিকার ও সম্ভাবনা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কাজ করছেন, তাঁদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। ভয়ভীতি কিংবা প্রাণনাশের হুমকির কারণে কোনো সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধাগ্রস্ত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষের তথ্য জানার অধিকারও।
এ প্রসঙ্গে অন্যান্য সংগঠনের নেতারাও নওশের আলম সুমনকে হত্যার হুমকির অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, অভিযোগটি কোনোভাবেই অবহেলা না করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করবে। অভিযোগের সঙ্গে কোনো সংঘবদ্ধ মাদক বা অপরাধচক্রের সম্পৃক্ততা তদন্তে প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, একজন সাংবাদিককে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁর কণ্ঠ রোধের চেষ্টা কোনোভাবেই কাম্য নয়। অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়েই এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব।
প্রবাসী সাংবাদিক ও রেমিট্যান্সযোদ্ধা নওশের আলম সুমনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশে নিরাপদে ফেরার পরিবেশ তৈরি করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে—এমন প্রত্যাশা জানিয়েছেন তাঁর সহকর্মী, প্রবাসী কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।




