
বাংলাদেশের কৃষির চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় কৃষি বলতে ধান, পাট, গম বা কিছু প্রধান ফসলকে বোঝানো হলেও বর্তমানে মানুষের খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টিচাহিদা ও বাজারব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সবজির গুরুত্বও বহুগুণ বেড়েছে। শহর থেকে গ্রাম, প্রায় প্রতিটি পরিবারের খাদ্যতালিকায় এখন বিভিন্ন ধরনের সবজি নিয়মিত জায়গা করে নিয়েছে। একই সঙ্গে সবজি কৃষকের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নগদ অর্থকরী ফসল হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে।
সবজি শুধু খাদ্য নয়, এটি পুষ্টি, কর্মসংস্থান, কৃষকের আয় এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। শাকসবজিতে ভিটামিন, খনিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, খাদ্যআঁশসহ নানা প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান রয়েছে। তাই একটি সুস্থ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে সবজির উৎপাদন ও সহজলভ্যতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
কিন্তু ভবিষ্যতে বাংলাদেশে সবজি উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি রয়েছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জও। কৃষিজমি ক্রমাগত কমছে, শ্রম ও উৎপাদন খরচ বাড়ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার ধরন বদলাচ্ছে। কোথাও খরা, আবার কোথাও জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা দেখা দিচ্ছে। রোগ-পোকামাকড়ের নতুন সমস্যাও তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে ভোক্তারা চাইছেন নিরাপদ, বিষমুক্ত, সুস্বাদু, পুষ্টিকর এবং দেখতে আকর্ষণীয় সবজি। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় আগামী দিনের সবজি উৎপাদনের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে আধুনিক উদ্ভাবনী গবেষণা ও প্রযুক্তি।
শুধু বেশি ফলন নয়, দরকার ‘স্মার্ট’ জাত
সবজি উৎপাদন বাড়ানোর কথা বললে প্রথমেই উচ্চফলনশীল জাতের কথা আসে। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য শুধু উচ্চফলনশীল জাত যথেষ্ট নয়। এমন জাত প্রয়োজন, যা একই সঙ্গে প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করতে পারবে এবং কৃষকের জন্য লাভজনক হবে।
উদাহরণস্বরূপ, গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতায় অনেক সবজির ফুল ঝরে যায়, ফলন কমে যায় এবং রোগ-পোকামাকড়ের আক্রমণ বাড়ে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা এবং দেশের অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা সবজি উৎপাদনের বড় বাধা। তাই গবেষকদের এমন জাত উদ্ভাবন করতে হবে, যা তাপ, খরা, লবণাক্ততা বা জলাবদ্ধতার মতো প্রতিকূলতা সহ্য করতে পারে।
আগামী দিনের একটি আদর্শ ‘স্মার্ট’ সবজি জাতের বৈশিষ্ট্য হতে হবে—উচ্চফলনশীল, প্রতিকূল পরিবেশসহনশীল, সারা বছর চাষোপযোগী, রোগ-পোকামাকড় প্রতিরোধী, উন্নত পুষ্টিমান, স্বাদ ও গুণমানসমৃদ্ধ এবং দীর্ঘ সংরক্ষণক্ষমতাসম্পন্ন।
বছরব্যাপী ও গ্রীষ্মকালীন জাত
বাংলাদেশে শীতকালীন সবজির উৎপাদন তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও গ্রীষ্মকালে অনেক সবজির উৎপাদন কমে যায়। ফলে মৌসুমি ঘাটতি তৈরি হয় এবং বাজারে দাম বেড়ে যায়। এই সমস্যা সমাধানে গ্রীষ্মকালীন সবজি গবেষণার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শিম এ ধরনের সমস্যার একটি চমৎকার উদাহরণ। বাংলাদেশের স্থানীয় শিমের জার্মপ্লাজমে রয়েছে ব্যাপক বৈচিত্র্য। অনেক স্থানীয় শিম শীতকালীন পরিবেশে ভালো ফলন দিলেও দিনের দৈর্ঘ্য ও তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে গ্রীষ্মকালে সহজে ফুল ও ফল ধারণ করে না। ফলে গ্রীষ্মকালীন চাষের জন্য উপযোগী জাতের সংখ্যা সীমিত।
গবেষণার মাধ্যমে দিনের দৈর্ঘ্যের প্রতি অসংবেদনশীল, দ্রুত ফুল আসা, উচ্চফলনশীল এবং তাপ ও আর্দ্রতাসহনশীল গ্রীষ্মকালীন শিমের জাত উদ্ভাবন করা গেলে সারা বছর শিম উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
এ ক্ষেত্রে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ গ্রীষ্মকালীন এবং আলোক-অসংবেদনশীল শিমের জাত উদ্ভাবন নিয়ে দীর্ঘ ৬–৭ বছর গবেষণা করে অনেকগুলো স্থিতিশীল উন্নত অগ্রসরমান লাইন উদ্ভাবনের কাজ সম্পন্ন করেছে। এই লাইনগুলো আলোক-অসংবেদনশীল, আগাম ও স্থিতিশীলভাবে ফুলধারণে সক্ষম, উচ্চ ফলনক্ষমতাসম্পন্ন এবং উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতাসহনশীল। পাশাপাশি এগুলোর ফল আকর্ষণীয় আকার ও রঙের, নরম ও কম আঁশযুক্ত, স্বাদে শীতকালীন শিমের মতো, ভালো বীজ উৎপাদনক্ষম এবং রোগ ও পোকামাকড়সহনশীল। অচিরেই এই লাইনগুলো কৃষকের চাষাবাদের জন্য অবমুক্ত করা হবে।
একই ধরনের গবেষণা টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শসা, বেগুন, মরিচসহ বিভিন্ন সবজিতেও করা প্রয়োজন। সবজি উৎপাদনের ভবিষ্যৎ গবেষণার আরেকটি বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত বছরব্যাপী উৎপাদনশীল জাত উদ্ভাবন।
একটি জাত যদি কেবল নির্দিষ্ট একটি মৌসুমে ভালো ফলন দেয়, তাহলে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হয়। কিন্তু বছরব্যাপী উৎপাদনশীল জাত উদ্ভাবন করা গেলে এবং এসব জাত বিভিন্ন মৌসুমে গ্রহণযোগ্য ফলন দিতে সক্ষম হলে উৎপাদন ও বাজার সরবরাহ উভয়ই স্থিতিশীল হবে। এজন্য উদ্ভিদের ফুল আসার সময়, দিনের দৈর্ঘ্যের প্রতিক্রিয়া, তাপমাত্রার প্রভাব, পরাগায়ন, ফল ধারণ এবং পরিপক্বতার মতো বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করা বিশেষ প্রয়োজন।
দেশীয় জিনভাণ্ডার সংরক্ষণ ও হাইব্রিড উন্নয়ন
বাংলাদেশের কৃষকের হাতে বহু প্রজন্ম ধরে সংরক্ষিত দেশীয় সবজির বৈচিত্র্য রয়েছে। স্থানীয় শিম, বেগুন, লাউ, কুমড়া, শাকসহ বিভিন্ন সবজির মধ্যে ফলন, স্বাদ, রং, আকার, রোগ প্রতিরোধ এবং পরিবেশসহনশীলতার ব্যাপক পার্থক্য দেখা যায়। কিন্তু এসব স্থানীয় জাত ও জার্মপ্লাজমের অনেকগুলোই দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।
এসবের সঠিক সংগ্রহ → সংরক্ষণ → চরিত্রায়ন → মূল্যায়ন → নির্বাচিত বৈশিষ্ট্য শনাক্তকরণ → জাত উন্নয়নে ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো স্থানীয় জাত হয়তো খুব বেশি ফলন দেয় না, কিন্তু তীব্র তাপ সহ্য করতে পারে। অন্য একটি জাত হয়তো রোগ প্রতিরোধী। আবার কোনো জাতের ফল ছোট হলেও স্বাদ ও পুষ্টিমান অত্যন্ত ভালো। গবেষণার মাধ্যমে এসব বৈশিষ্ট্যকে উন্নত জাতের মধ্যে স্থানান্তর করা সম্ভব।
অতএব, দেশীয় সবজি জার্মপ্লাজম শুধু ঐতিহ্য নয়—এটি ভবিষ্যৎ সবজি গবেষণার জীবন্ত জিনভাণ্ডার। এগুলোর সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে আমরা জানি, হাইব্রিড জাত উচ্চফলনশীল, উন্নত গুণমানসম্পন্ন এবং অনেক ক্ষেত্রে রোগ-পোকা প্রতিরোধী। সুতরাং সবজির হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন ফলন বৃদ্ধির আরেকটি হাতিয়ার হতে পারে।
ইতিমধ্যে টমেটো, বেগুন, মরিচ, শসা, লাউ, করলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি ইত্যাদি অনেক সবজির হাইব্রিড জাত কৃষকের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে, যার একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে আসে। তাই দেশীয় জার্মপ্লাজমকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় পরিবেশ উপযোগী উন্নত প্যারেন্টাল লাইন ও হাইব্রিড উদ্ভাবনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এর ফলে একদিকে যেমন নতুন হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন হবে, অন্যদিকে বিদেশি বীজের ওপর নির্ভরশীলতাও কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। এর জন্য পুংবন্ধ্যাত্ব (male sterility), স্ব-অসঙ্গতি (self-incompatibility), স্ত্রীফুলধারী লাইন (gynoecious line), পার্থেনোকার্পি (parthenocarpy) এবং সংকর বল (heterosis)-এর মতো আধুনিক ব্রিডিং পদ্ধতি কাজে লাগানো যেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গবেষণা
বাংলাদেশের কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যে বিভিন্নভাবে দৃশ্যমান হয়েছে এবং হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা, জলাবদ্ধতা, খরা এবং উপকূলীয় লবণাক্ততা কৃষির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
সবজি তুলনামূলকভাবে সংবেদনশীল ফসল হওয়ায় এই পরিবর্তনের প্রভাব সবজিতে দ্রুত দেখা যায়। তাই অঞ্চলভিত্তিক প্রতিকূল পরিবেশ উপযোগী সবজির জাত উন্নয়নে গবেষণা প্রয়োজন।
যেমন—উপকূলের জন্য লবণাক্ততাসহনশীল সবজি, হাওর ও নিম্নাঞ্চলের জন্য জলাবদ্ধতাসহনশীল জাত, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য খরা ও তাপসহনশীল জাত, উষ্ণ ও আর্দ্র এলাকার জন্য রোগসহনশীল জাত এবং শহরাঞ্চলের জন্য স্বল্প জায়গায় উৎপাদনযোগ্য সবজির জাত উদ্ভাবন প্রয়োজন।
একটি জাত সব অঞ্চলের জন্য উপযোগী হবে—এমন ধারণা থেকে বের হয়ে স্থান ও পরিবেশভিত্তিক জাত উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে।
রোগ-পোকা দমনে নতুন চিন্তা
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবজি চাষাবাদে নতুন নতুন রোগ ও পোকামাকড়ের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। রোগ-পোকা দমনে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এর সমাধান শুধু বেশি কীটনাশক ব্যবহার নয়, বরং রোগ-পোকা প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ, ফেরোমোন ফাঁদ (pheromone trap), পরিচ্ছন্ন মাঠে চাষাবাদ (field sanitation) এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (integrated pest management)-এর সমন্বিত ব্যবহার প্রয়োজন।
সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই সমাধান হতে পারে পোষক উদ্ভিদের প্রতিরোধ ক্ষমতা (host-plant resistance)—অর্থাৎ এমন জাত উদ্ভাবন করা, যেগুলো নিজেরাই নির্দিষ্ট রোগ বা পোকার আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে।
কম জমিতে বেশি উৎপাদন
বাংলাদেশে কৃষিজমির পরিমাণ সীমিত এবং প্রতিদিন বিভিন্ন কারণে দেশের কৃষিজমির পরিমাণ কমছে। ফলে ভবিষ্যৎ কৃষিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে—কম জমিতে কীভাবে বেশি সবজি উৎপাদন করা যায়?
এ ক্ষেত্রে সুরক্ষিত চাষাবাদ (protected cultivation), নেট হাউস (net house), পলিহাউস (poly house), ছাদবাগান (rooftop gardening), একাধিক স্তর বা উল্লম্ব চাষাবাদ (vertical farming), জলেচাষ (hydroponics)-সহ অন্যান্য নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের প্রযুক্তি নিয়ে বিস্তর গবেষণা প্রয়োজন।
বিশেষ করে শহর ও শহরতলিতে বাড়ির ছাদ, ছোট জায়গা এবং অব্যবহৃত স্থানকে সবজি উৎপাদনের আওতায় আনা গেলে সবজির উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে।
অন্যদিকে সবজি উৎপাদনে পানি ও সারের ব্যবহার যথাযথ না হলে উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং পরিবেশের ওপরও চাপ পড়ে। তাই ভবিষ্যতে ফোঁটা ফোঁটা সেচ (drip irrigation), সেচের পানির সঙ্গে সার প্রয়োগ (fertigation), মাটির আর্দ্রতা পরিমাপক সেন্সর (soil moisture sensor), সুনির্দিষ্ট পুষ্টি ব্যবস্থাপনা (precision nutrient management) এবং প্রয়োজনভিত্তিক সেচ ও সার ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে, যাতে কম পানি ও কম সার ব্যবহার করে কম খরচে বেশি উৎপাদন করা যায়।
আধুনিক প্রজনন পদ্ধতির ব্যবহার
জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, খরা, জলাবদ্ধতা ও নতুন নতুন রোগ-পোকার আক্রমণের কারণে নিরাপদ ও পুষ্টিকর সবজি উৎপাদন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভিদ প্রজননের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভিদ প্রজনন পদ্ধতি এখন আর শুধু দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর ডিএনএ-আরএনএ (DNA-RNA) পর্যায়েও পৌঁছে গেছে।
জিনোমিক নির্বাচন (genomic selection), মার্কার-সহায়ক নির্বাচন (marker-assisted selection), জিনোম-ওয়াইড অ্যাসোসিয়েশন স্টাডি (GWAS), জিন সম্পাদনা (gene editing), দ্রুত প্রজনন (speed breeding), হাই-থ্রুপুট ফেনোটাইপিং (high-throughput phenotyping) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (artificial intelligence)-নির্ভর তথ্য বিশ্লেষণ সবজি গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে।
এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কম সময়ে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যের জিন শনাক্ত ও নির্বাচন করা, প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সক্ষম জাত উদ্ভাবন, রোগ-পোকা প্রতিরোধ, উচ্চ ফলন, উন্নত পুষ্টিমান, দীর্ঘ সংরক্ষণক্ষমতা এবং ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী গুণগত বৈশিষ্ট্য সমন্বিত করা সম্ভব।
এমনকি কোনো বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত DNA marker বা RNA শনাক্ত করা গেলে সেই DNA-RNA marker ব্যবহার করে প্রজন্মের শুরুতেই কাঙ্ক্ষিত উদ্ভিদ নির্বাচন করা সম্ভব।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI এখন আর শুধু কম্পিউটার বিজ্ঞানের বিষয় নয়। কৃষিতেও এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এর মাধ্যমে গবেষক কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার গাছ স্বল্প সময়ে পর্যবেক্ষণ করতে এবং এসব তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করতে পারেন।
ক্যামেরা বা ড্রোনের মাধ্যমে একটি জমির হাজার হাজার গাছের ছবি সংগ্রহ করে AI দিয়ে উদ্ভিদের বৃদ্ধি, রোগের লক্ষণ, ফলের সংখ্যা, ফলের আকার ও পরিপক্বতা খুব অল্প সময়ে শনাক্ত করা সম্ভব।
তবে এসব আধুনিক প্রজনন প্রযুক্তির সফল প্রয়োগের জন্য উন্নত গবেষণা অবকাঠামো, জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ, দক্ষ জনবল, তথ্য ও ডেটা ব্যবস্থাপনা, বহুমাত্রিক মাঠপরীক্ষা এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষক ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আবার এসব প্রযুক্তির সঙ্গে বায়োসেফটি আইন, নীতিমালা এবং ভোক্তার গ্রহণযোগ্যতার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
গবেষণায় কৃষকের অংশীদারিত্ব
গবেষণাগারে উদ্ভাবিত জাত সরাসরি মাঠে সফল হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কৃষকের জমির পরিবেশ, ব্যবস্থাপনা, শ্রম, বাজার ও স্থানীয় চাহিদা অনেক সময় গবেষণাগারের পরীক্ষার চেয়ে ভিন্ন। তাই কৃষককে শুধু নতুন জাতের ব্যবহারকারী হিসেবে নয়, গবেষণার অংশীদার হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কৃষকের অভিজ্ঞতা ও গবেষকের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান একত্রিত করে participatory vegetable breeding ও participatory varietal selection করা গেলে বাস্তবসম্মত জাত উদ্ভাবনের সম্ভাবনা বাড়বে।
এ ছাড়া সবজি গবেষণার শেষ লক্ষ্য শুধু নতুন জাত উদ্ভাবন হওয়া উচিত নয়, বরং সেই জাত কৃষকের আয় বাড়াচ্ছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। একটি জাত উচ্চফলনশীল হলেও যদি বীজের দাম বেশি হয়, উৎপাদন খরচ বেশি হয়, বাজারে চাহিদা কম থাকে বা পরিবহন ও সংরক্ষণে সমস্যা হয়, তাহলে কৃষকের জন্য তা আকর্ষণীয় নাও হতে পারে।
তাই ভবিষ্যতের গবেষণায় breeding + agronomy + economics + market + consumer preference—এই সবগুলো বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করে কৃষকের জন্য লাভজনক সবজির জাত উদ্ভাবন করতে হবে।
ভবিষ্যৎ গবেষণার অগ্রাধিকার
আগামী দিনে বাংলাদেশে সবজি গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে নিম্নের বিষয়গুলো—
১. উচ্চফলনশীল ও পুষ্টিসমৃদ্ধ সবজি জাত উদ্ভাবন।
২. গ্রীষ্মকালীন, স্বল্পমেয়াদি ও বছরব্যাপী সবজি জাত উদ্ভাবন।
৩. তাপ, খরা, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতাসহনশীল জাত উদ্ভাবন।
৪. রোগ ও পোকা প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন।
৫. দেশীয় প্যারেন্টাল লাইন ব্যবহার করে হাইব্রিড সবজি উন্নয়ন।
৬. সবজি গবেষণায় আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভিদ প্রজননের ব্যবহার বাড়ানো।
৭. দেশীয় জার্মপ্লাজমের সংগ্রহ ও ব্যবহার বাড়ানো।
৮. সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ সংক্রান্ত গবেষণা।
৯. কৃষক, ভোক্তা ও বাজারভিত্তিক গবেষণা।
১০. কৃষকের অংশগ্রহণমূলক সবজি গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়ন।
১১. জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অঞ্চলভিত্তিক সবজি উৎপাদন প্রযুক্তির উন্নয়ন।
বাংলাদেশের সবজি খাতের সামনে চ্যালেঞ্জ যেমন অনেক, সম্ভাবনাও তেমনি বিশাল। দেশের বৈচিত্র্যময় কৃষি-পরিবেশ, সমৃদ্ধ স্থানীয় জার্মপ্লাজম, দক্ষ কৃষক, ক্রমবর্ধমান বাজার এবং আধুনিক কৃষিবিজ্ঞানের অগ্রগতি—সব মিলিয়ে সবজি উৎপাদনে নতুন বিপ্লবের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই বিপ্লব শুধু নতুন জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে হবে না। প্রয়োজন হবে জেনেটিক সম্পদ থেকে শুরু করে জাত উন্নয়ন, উৎপাদন প্রযুক্তি, পানি ও সার ব্যবস্থাপনা, রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণ, সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আধুনিক উদ্ভিদ প্রজনন প্রযুক্তির ব্যবহার।
গবেষণার মাধ্যমে আমরা যদি এমন সবজি জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারি, যা আগামী দিনের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উচ্চ তাপমাত্রা, পানি সংকট, লবণাক্ততা ও জমির সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ভালো উৎপাদন দিতে পারে, তাহলে সবজি শুধু কৃষকের আয়ের উৎসই থাকবে না—এটি বাংলাদেশের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হবে।
লেখক: জেনেটিক্স অ্যান্ড প্ল্যান্ট ব্রিডিং বিভাগ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।




