
ইতালির ঐতিহাসিক বন্দরনগরী জেনোয়া। প্রচলিত ঐতিহাসিক মত অনুযায়ী, এই শহরেই জন্মেছিলেন বিশ্ব ইতিহাসের আলোচিত নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস। সমুদ্রপথে নতুন ভূখণ্ডের সন্ধানে যাত্রা করা সেই শহর আজও ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী। তবে জেনোয়ার আরেকটি পরিচয় তৈরি হয়েছে গত কয়েক দশকে— এখানে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশিদের একটি দৃশ্যমান জনপদ।
শহরের কিছু এলাকায় হাঁটলে মনে হতে পারে, ইতালির কোনো শহরে নয়—বাংলাদেশের শরীয়তপুরের কোনো জনপদে হাঁটছেন। দোকান, রেস্টুরেন্ট, কর্মক্ষেত্র কিংবা পরিচিত মুখ— সবখানেই পাওয়া যায় বাংলাদেশিদের উপস্থিতি। আর এই উপস্থিতির বড় একটি অংশ এসেছে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলা ও আশপাশের এলাকা থেকে।
জেনোয়ায় বাংলাদেশিদের অভিবাসনের এই বিস্তারের পেছনে রয়েছে একেকটি পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রাম, পরস্পরকে সহযোগিতা এবং প্রবাসে নিজেদের জন্য তৈরি করা নেটওয়ার্ক। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ নড়িয়ার ঘড়িসার ইউনিয়নের পূর্ব নন্দন শাহ গ্রামের ঢালী পরিবার।
শুরুটা ১৯৮২ সালে
১৯৮২ সালে ইতালিতে পাড়ি জমান লুৎফর রহমান ঢালী। রোম দিয়ে শুরু হয় তার ইতালি-জীবন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ইতালিতে নিজের অবস্থান তৈরি করার পর তিনি আত্মীয়স্বজন ও গ্রামের মানুষের জন্যও পথ তৈরি করতে শুরু করেন।
কেউ কীভাবে ইতালিতে আসবেন, কোথায় থাকবেন, কীভাবে কাজ খুঁজবেন—এসব ক্ষেত্রে তিনি পরিচিতদের সহযোগিতা করতেন। ধীরে ধীরে একটি ব্যক্তিগত যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি হয়। ২০১০ সালে লুৎফর রহমান মারা গেলেও তার তৈরি করা সেই নেটওয়ার্ক থেমে যায়নি। বরং পরবর্তী সময়ে সেটি আরও বিস্তৃত হয়েছে।
তার ভাই ফজলুর রহমান ঢালীও প্রায় ২৯ বছর ইতালিতে ছিলেন। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি নিজের পরিবারের বাইরে নড়িয়ার গ্রামের প্রায় অর্ধশত মানুষকে ইতালিতে আসতে সহযোগিতা করেন। তাদের অনেকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করেন তিনি।
একজনের অভিবাসন থেকে শুরু হওয়া যাত্রা এভাবেই ধীরে ধীরে রূপ নেয় একটি সামাজিক নেটওয়ার্কে।
চার ভাইয়ের ১৯ রেস্টুরেন্ট
লুৎফর রহমান ও ফজলুর রহমানের পর ঢালী পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম এখন জেনোয়ায় ব্যবসায় নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।
ফজলুর রহমান ঢালীর চার ছেলে—সুজন, সবুজ, সজিব ও রাজিব ঢালী। পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, চার ভাই বর্তমানে জেনোয়ায় ১৯টি রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করছেন। এর পাশাপাশি রয়েছে হোটেল ব্যবসাও।
এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০০ বাংলাদেশির কর্মসংস্থান হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
সুজন ঢালী বলেন, “চাচা একটা পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন। পরে সেই পথ ধরে অনেক মানুষ এসেছে। এখন আমাদের প্রজন্ম ব্যবসা-বাণিজ্যে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অন্য বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে।”
ব্যবসার পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের সুযোগও বেড়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। রেস্টুরেন্টগুলোতে রান্না, পরিবেশন, ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য কাজে বাংলাদেশিরা যুক্ত রয়েছেন।
জেনোয়ায় প্রায় ১০০ ঢালী
পরিবারের সদস্যদের দাবি, বর্তমানে জেনোয়ায় ঢালী পরিবারের প্রায় ১০০ সদস্য বসবাস করছেন। তাদের কেউ ব্যবসা করছেন, কেউ চাকরি করছেন, আবার কেউ রেস্টুরেন্ট, হোটেল ও বিভিন্ন সেবা খাতে যুক্ত।
একটি পরিবারের এত বড়সংখ্যক সদস্যের একই শহরে বসবাসের পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের অভিবাসনপ্রবাহ।
প্রথম প্রজন্ম ইতালিতে এসে যে পথ তৈরি করেছে, পরবর্তী প্রজন্ম সেই পথ ধরে এসেছে। এরপর আত্মীয়তা, পরিচিতি ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আরও মানুষ যুক্ত হয়েছে।
অভিবাসন গবেষকদের কাছে এটি ‘চেইন মাইগ্রেশন’-এর একটি স্থানীয় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে—একজন বা কয়েকজনের মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে পরবর্তী সময়ে আত্মীয় ও পরিচিতদের একটি অংশ একই পথে পাড়ি জমায়।
নড়িয়া থেকে ইতালির বিভিন্ন শহরে
ঢালী পরিবারের গল্প অবশ্য জেনোয়ায় শরীয়তপুরের মানুষের বৃহত্তর উপস্থিতির একটি অংশমাত্র।
সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নড়িয়া ও আশপাশের এলাকার বহু মানুষ এখন জেনোয়া ছাড়াও রোম, মিলানসহ ইতালির বিভিন্ন শহরে বসবাস করছেন।
সুজন ঢালীর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, বৃহত্তর নড়িয়া ও আশপাশের এলাকার প্রায় সহস্রাধিক মানুষ ইতালির বিভিন্ন শহরে বসবাস করছেন।
তবে এই সংখ্যার কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। ফলে সংখ্যাটি সংশ্লিষ্টদের দেওয়া আনুমানিক হিসাব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
প্রবাসের আয় বদলেছে গ্রামের চিত্র
ইতালিতে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের অনেকেই শুধু নিজেদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন করেননি; দেশে থাকা পরিবারের আর্থিক অবস্থাতেও পরিবর্তন এনেছেন।
জেনোয়ায় বসবাসরত নড়িয়ার কয়েকজন বাংলাদেশি জানান, প্রবাসী আয়ের অর্থে দেশে বাড়ি নির্মাণ, জমি কেনা, সন্তানদের লেখাপড়া, ব্যবসা ও অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করেছেন অনেকে।
ফলে একজনের বিদেশযাত্রার সুফল অনেক সময় একটি পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে।
ঢালী পরিবারের সংশ্লিষ্টদের দাবি, ইতালিতে তাদের বিভিন্ন ব্যবসা ও আয়ের উৎস মিলিয়ে বছরে আনুমানিক ১২ লাখ ইউরোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড রয়েছে। তবে এর কতটা বাংলাদেশে পাঠানো হয় কিংবা দেশে কী পরিমাণ বিনিয়োগ করা হয়, তার নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।
কলম্বাসের শহরে বাংলাদেশের গল্প
জেনোয়া শুধু ইতালির একটি শহর নয়; ইউরোপের সামুদ্রিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ও এই শহরের সঙ্গে যুক্ত। প্রচলিত ঐতিহাসিক মত অনুযায়ী, ক্রিস্টোফার কলম্বাসের জন্ম এই শহরে। সমুদ্রপথে অজানার সন্ধানে যাত্রা করা কলম্বাসের শহরেই কয়েক শতাব্দী পর বাংলাদেশের মানুষও জীবনের নতুন সম্ভাবনার সন্ধানে এসে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন।
তাদের যাত্রার উদ্দেশ্য অবশ্য ছিল ভিন্ন— কেউ এসেছেন জীবিকার সন্ধানে, কেউ পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলাতে, কেউবা ব্যবসার সুযোগ তৈরি করতে।
কিন্তু কয়েক দশকের ব্যবধানে সেই ব্যক্তিগত অভিবাসন এখন অনেকের জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।
১৯৮২ সালে লুৎফর রহমান ঢালীর ইতালিযাত্রা ছিল এক ব্যক্তির গল্প। এরপর ভাই ফজলুর রহমান, তারপর তাদের সন্তান ও আত্মীয়স্বজন—এভাবে চার দশকে তা একটি বড় পারিবারিক পরিসরে বিস্তৃত হয়েছে।
একজনের হাত ধরে শুরু হওয়া পথ এখন অন্যদের কর্মসংস্থানের পথও তৈরি করছে।
একজন থেকে শতজন, পরিবার থেকে অঞ্চল— কলম্বাসের ঐতিহাসিক জেনোয়ায় শরীয়তপুরের নড়িয়ার মানুষের এই বিস্তার যেন প্রবাসে বাংলাদেশের আরেকটি ছোট্ট ঠিকানা।




