
একটি দেশ শুধু তার সরকার দিয়ে চলে না। একটি দেশ এগিয়ে যায় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম, ব্যবসায়ী সমাজ এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের সম্মিলিত দায়িত্ববোধে। তাই কোনো পরিস্থিতিতে দেশে অস্থিরতা তৈরি হলে সেটিকে শুধু রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর।
বর্তমান সময়ে নানা ধরনের গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, সংঘাত ও অস্থিরতার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিতে পারে। কেউ যদি সত্যিই রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়, তাহলে তার সবচেয়ে বড় ক্ষতি শেষ পর্যন্ত সরকারের নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি।
এ কারণেই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দায়িত্বশীলতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যেমন পেশাদারিত্ব, ধৈর্য ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে দায়িত্ব পালন করতে হবে, তেমনি জনগণকেও আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করতে হবে। অপরাধী যেই হোক, তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়াই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের নীতি।
সরকারের পক্ষ থেকেও সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত হয়েছে। ২০২৬ সালে এ উদ্দেশ্যে জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন এবং পরে তা পুনর্গঠনের সরকারি উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তবে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মাঠে নামিয়ে দিলেই একটি দেশের শান্তি নিশ্চিত করা যায় না। পুলিশের পাশাপাশি প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল, শিক্ষক, সাংবাদিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সর্বস্তরের নাগরিককে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই না করে কোনো খবর ছড়িয়ে দেওয়া থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। একটি মিথ্যা তথ্য কখনো কখনো বাস্তব সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। একটি গুজব মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে, আবার একটি উসকানিমূলক বক্তব্য মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। তাই তথ্য যাচাই না করে কোনো বক্তব্য, ছবি বা ভিডিও প্রচার করা এখন শুধু অসতর্কতা নয়—কখনো কখনো তা বড় ধরনের সামাজিক ক্ষতির কারণও হতে পারে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, সরকার পরিবর্তন হতে পারে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, নীতির সমালোচনা হতে পারে—এসব গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু রাষ্ট্রের শান্তি, মানুষের নিরাপত্তা এবং নাগরিকের জানমালের সুরক্ষা কোনো দল বা মতের বিষয় নয়; এটি সবার দায়িত্ব।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিও একটি কথা বলা জরুরি—অপরাধ দমন করতে গিয়ে যেন নিরপরাধ কোনো মানুষ হয়রানির শিকার না হন। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত হবে, প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা হবে এবং আদালতের প্রক্রিয়াকে সম্মান করা হবে—এটাই আইনের শাসনের সৌন্দর্য। একইভাবে জনগণেরও উচিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব পালনে বাধা না দিয়ে অপরাধের তথ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো।
দেশের মানুষ শান্তি চায়। একজন শ্রমিক তার কর্মস্থলে যেতে চান, একজন ব্যবসায়ী নিরাপদে ব্যবসা করতে চান, একজন শিক্ষার্থী নির্বিঘ্নে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে চান, একজন অভিভাবক তার সন্তানকে নিরাপদে দেখতে চান। এই সাধারণ চাওয়াগুলোই একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
তাই অস্থিরতা সৃষ্টি করে কোনো পক্ষ সাময়িক রাজনৈতিক বা অন্য কোনো সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করলে তার মূল্য যেন সাধারণ মানুষকে দিতে না হয়। রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে এবং জনগণকেও হতে হবে সচেতন ও দায়িত্বশীল।
আমরা বিরোধিতা করব অন্যায়ের, সমালোচনা করব ভুলের, প্রশ্ন করব রাষ্ট্রের কাছে—কিন্তু দেশের শান্তি ও মানুষের নিরাপত্তাকে কোনোভাবেই বিসর্জন দেওয়া যাবে না।
দেশ কারও একার নয়। সরকারও দেশের একটি অংশ, বিরোধী মতও দেশের অংশ, আর কোটি কোটি সাধারণ মানুষই এই রাষ্ট্রের মূল শক্তি। তাই বিভেদ নয়, দায়িত্বশীলতা; সংঘাত নয়, আইনের শাসন; গুজব নয়, সত্য তথ্য—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
অস্থিরতা দিয়ে নয়, ঐক্য ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমেই একটি দেশ শক্তিশালী হয়। আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেই শক্তির পরিচয় দেওয়া।




