
কে না জানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অন্য সব রাজনীতিবিদের মতো কাজ-কর্মে এখন আর গতানুগতিক নন। কে না জানে রাষ্ট্রের শীর্ষ নির্বাহী হয়েও তিনি এখন অতি সাধারণ জীবনযাপন করেন। কথার চেয়ে কাজের চর্চার মধ্য দিয়ে তিনি প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা দিয়ে চলেছেন। তার সাদাসিধে ব্যক্তিত্ব আর স্বচ্ছতা সবার জন্যই অনুকরণীয়। সম্প্রতি দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ও সংকট নিয়ে নিজের অকপট স্বীকারোক্তি তাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একদিকে তিনি সরকারপ্রধান হিসেবে বিদ্যমান সংকটকে মেনে নিচ্ছেন, অন্যদিকে তা থেকে উত্তরণে সর্বশক্তি দিয়ে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।
রাষ্ট্র ক্ষমতায় বিএনপি; কিন্তু তাই বলে পুরো বিদ্যুৎ সংকটটি এই সরকারের তৈরি বিষয়টি এমন নয়। তারপরও প্রধানমন্ত্রী জাতির কাছে যেভাবে সংকটের সরল স্বীকারোক্তি করেছেন, তাতে রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অনন্য উদাহরণ তৈরি করে তিনি ছোট হয়ে যাননি; বরং এর মধ্য দিয়ে তিনি বড় মনের পরিচয় দিয়েছেন। এটিই উন্নত রাজনীতির মহিমান্বিত দিক। এমন চর্চা যেমন তার মহৎপ্রাণ দৃষ্টিভঙ্গির সরল প্রকাশ; তেমনি সংসদের মতো রাষ্ট্রের আশা-ভরসার কেন্দ্রস্থলে বিদ্যুৎ সংকটের জন্য বিদ্যুৎমন্ত্রীকে এককভাবে দায়ী করে দেওয়া কিছু বিতর্কিত মন্তব্য নানা প্রশ্নের জন্মও দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উদারতার প্রশংসা যেমন তার প্রাপ্য, তেমনি কেবিনেটের কারও নিন্দা বা সমালোচনাও প্রকারান্তরে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ কিংবা নিন্দার শামিল। কারণ তিনিই সরকারপ্রধান। তার কোনো মন্ত্রীর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে অকারণে তাকে দায়ী করা হলে, এটিও প্রধানমন্ত্রীর অসম্মানের কারণ হতে পারে।
জাতীয় সংসদ মানুষের যাবতীয় প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু সম্প্রতি দেখা গেছে, সেখানে বিদ্যুৎমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলা হয়, ‘মাননীয় মন্ত্রীর কাছ থেকে শুনি, তার লম্বা, তাই বিদ্যুৎ চলে যায়।’
প্রধানমন্ত্রীকে প্রশংসা করার বিপরীতে বিদ্যুৎমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে এমন অসম্মানজনক মন্তব্য বিভিন্ন মহলে বেশ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকে এ ধরনের মন্তব্যকে খুবই দুঃখজনক ও অপ্রত্যাশিত বলে সমালোচনা করছেন।
সংসদের প্রত্যেক সদস্যই সম্মানিত। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে তারা সংসদে দেশ-জাতির স্বার্থে নানা বিষয়ে কথা বলেন, বিতর্ক করেন; আবার সমাধানেরও পথ তৈরি করেন। এই যে সংসদের সৌন্দর্য, এটি নষ্ট হয়, যখন সংসদেরই কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি অন্যায্যভাবে কোনো বিষয়ে কাউকে দায় দেন। কোনো একটি সংকটের যৌক্তিক কারণকে উপেক্ষা করে যখন ব্যক্তির মর্যাদাহানির লক্ষ্যে পক্ষপাতদুষ্ট তির্যক মন্তব্য করা হয়, তখন সেটি পুরো সরকারব্যবস্থার কাঠামো, নেতৃত্বে আর ইমেজে গিয়ে আঘাত করে।
আমরা যদি বিদ্যুৎ সংকট নিয়েই কথা বলি, তাহলে এর নেপথ্যের কারণও আমাদের জানা দরকার। একজন মন্ত্রী হচ্ছেন একটি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ নির্বাহী। আবার প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন সবার শীর্ষ নির্বাহী। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে তার দায় অবশ্যই আছে। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি কোনো একক সত্তা নন। তিনিও প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি টিমের সদস্য। আর মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে তিনি যখন কোনো কথা বলেন, তিনি মন্ত্রণালয়ের তার সহকর্মীদের মাধ্যমে অবগত হয়েই কিছু বলেন। তার সহকর্মীরাও তাকে একটি পরিস্থিতি সম্পর্কে পুঙ্খানুঙ্খ, কারিগরি ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা-দুর্বলতা পর্যালোচনা করেই অবহিত করে থাকেন। আর তিনিও সেভাবে প্রস্তুত হন।
দেশে বিদ্যুৎ সংকট রয়েছে। এটি কেউ অস্বীকার করবে না। কিন্তু কেন এই সংকট? কীভাবে এটি এই পর্যায়ে এলো? কারা এর নেপথ্যে? নিশ্চয়ই এসব প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার। বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে মাত্র সাত মাস হলো। বিদ্যুৎ খাতের মতো একটি বিশাল খাতের সংস্কার কিংবা এর কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে কাজ করার সুযোগও এখন হয়ে উঠেনি সরকারের। এটিই বাস্তবতা। একটি উদীয়মান অর্থনীতি, বিরাট শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বহুমাত্রিকতায় বিদ্যুতের অসীম চাহিদার বিপরীতে বিদ্যমান অবকাঠামো, কারিগরি দুর্বলতা, জনবল ও জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহসংক্রান্ত সমস্যাসহ নানা জটিল দিক রয়েছে, সেগুলো বিদ্যুৎ সঞ্চালন কিংবা বিতরণ ব্যবস্থায় প্রতিনিয়ত কী সংকট তৈরি করছে সেটি আমরা আমজনতা কতটুকুইবা জানি। এর সঙ্গে অনেক কারিগরি ও প্রকৌশলগত বিষয় জড়িয়ে রয়েছে। সেগুলো নিশ্চয়ই একবাক্যে বলা সম্ভব নয়।
অথচ পুরো বিদ্যুৎ খাতের সংকট, ত্রুটি-বিচ্যুতি কিংবা দুর্বলতাগুলো না জেনে একবাক্যে বিদ্যুৎমন্ত্রীকে দোষারোপ করে মন্তব্য করা সত্যিকার অর্থে পুরো সরকারকে, প্রধানমন্ত্রীকে, মন্ত্রণালয়ের প্রচেষ্টাকে খাটো করা ছাড়া আর কিছুই নয়। সংসদের মতো একটি দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে এ ধরনের মন্তব্য কেবল অবিচার-অন্যায্যই নয়; বরং অসম্মানের। বিদ্যুৎমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কেবিনেটের একজন সিনিয়র সদস্য। নিজে একজন মুুক্তিযোদ্ধা। অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান। আবার বয়োজ্যেষ্ঠও। সংসদে সমস্যা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হলে কারও আপত্তি থাকবে না। বিদ্যুৎ সংকট কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, এর নেপথ্যের প্রকৃত কারণ সবারই জানার অধিকার রয়েছে। কিন্তু শুধু মন্ত্রণালয়ের একজন মন্ত্রী হওয়ার কারণে সব দায় তাকে দিয়ে তির্যক মন্তব্য করার অর্থ হলো একজন সিনিয়র মন্ত্রীর প্রতি অবিচার করা। এটি চরম অপমানজনকও। এতে তিনি মর্মাহত হয়েছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সামাজিক মাধ্যমে এ রকম মন্তব্য বেশ মুখরোচক ও ‘ভিউবর্ধনমূলক’ ঠিকই, কিন্তু এর মধ্য দিয়ে অবশ্যই প্রকৃত কারণ উপেক্ষা করা হয়েছে।




