
বাংলাদেশের রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, শিক্ষা ও ভূ-বিজ্ঞান—বহুমাত্রিক অঙ্গনে দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ভূমিকার অধিকারী বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য, সাবেক মন্ত্রী, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভূ-বিজ্ঞানী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ৮১তম জন্মদিন ১ অক্টোবর।
১৯৪৬ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গয়েশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা খন্দকার আশরাফ আলী এবং মাতা হোসনে আরা হাসনা হেনা।
শিক্ষাজীবন থেকেই মেধা ও নেতৃত্বের স্বাক্ষর রাখা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ থেকে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে গিয়ে ১৯৭০ সালে ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে মাস্টার্স এবং ১৯৭৩ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূ-তত্ত্বে পিএইচডি অর্জন করেন।
ভূ-তত্ত্ব বিজ্ঞানের স্ট্রাকচারাল অ্যানালাইসিসে তাঁর উদ্ভাবিত ‘হোসেইনস মেথড অব এক্সটেনশন’ আন্তর্জাতিক ভূ-বিজ্ঞান অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করে। নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী অধ্যাপক আবদুস সালাম প্রতিষ্ঠিত আইসিটিপির অ্যাসোসিয়েট সদস্য এবং থার্ড ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্সের ফেলো হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রাজনৈতিক অভিযাত্রা
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেও তিনি দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে নীরব থাকেননি। প্রবাসী শিক্ষার্থী ও বাঙালি সমাজকে সংগঠিত করার পাশাপাশি ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’-এর আহ্বায়ক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত বিভাগীয় চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
এরপর তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। ১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। দলীয় রাজনীতিতে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে তিনি বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক, যুগ্ম মহাসচিব এবং কুমিল্লা (উত্তর) জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বিএনপির বর্তমান সাংগঠনিক নথিতেও তাঁকে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
সংসদ ও মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
দাউদকান্দি-মেঘনা অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিনের। কুমিল্লা-২, বর্তমানে দাউদকান্দি-মেঘনা আসন থেকে তিনি পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে স্বল্প সময়ের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকাকালে ২০০২ সালে তিনি জাতিসংঘের ৫৬তম বিশ্ব স্বাস্থ্য অ্যাসেম্বলির সভাপতি নির্বাচিত হন। তামাকবিরোধী আন্দোলনে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তাঁকে ‘ওয়ার্ল্ড নো টোব্যাকো অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে।
দাউদকান্দি মডেল ও জনকল্যাণ
দাউদকান্দির উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও ড. মোশাররফ হোসেনের ভূমিকা আলোচিত। বিশেষ করে ‘প্লাবনভূমিতে মৎস্য চাষ’ বা ‘দাউদকান্দি মডেল’ দেশের কৃষি ও মৎস্য খাতে একটি আলোচিত উদ্যোগ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে এবং জাতীয় স্বীকৃতিসহ স্বর্ণপদক অর্জন করে।
এছাড়া তিতাস উপজেলা প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলেজ, হাইস্কুল, এতিমখানা ও বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তাঁর উদ্যোগের কথা স্থানীয়ভাবে উল্লেখ করা হয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ড. মোশাররফ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তার বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
রাজনীতির পাশাপাশি লেখক ও গবেষক
রাজনীতিবিদ ও বিজ্ঞানীর পরিচয়ের পাশাপাশি লেখক ও গবেষক হিসেবেও ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের পরিচিতি রয়েছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক জার্নালে তাঁর ২১টির বেশি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি ও সমসাময়িক বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘মুক্তিযুদ্ধে বিলাত প্রবাসীদের অবদান’, ‘প্রগতি ও সত্যের সন্ধানে’, ‘রাজনীতির হালচাল’, ‘করোনা কালীন বাংলাদেশ’ এবং ‘আমার রাজনীতির রোজনামচা’।
দাউদকান্দির রাজনীতিতে এক পরিচিত নাম
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা প্রতিকূলতা, রাজনৈতিক আন্দোলন ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের মধ্য দিয়ে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বিএনপির রাজনীতিতে নিজের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন। বিশেষ করে কুমিল্লা-১ তথা দাউদকান্দি-মেঘনা অঞ্চলে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব ও সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিনের।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির কার্যক্রমে তাঁর অংশগ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসের দলীয় স্থায়ী কমিটির সভার নথিতেও তাঁর উপস্থিতির উল্লেখ রয়েছে।
রাজনীতির মাঠে মতপার্থক্য ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ হলেও, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাঁর মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা, শিক্ষকতা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এবং জনসম্পৃক্ত কর্মকাণ্ড—সবগুলো অধ্যায়ই বিবেচনায় আসে।
পরিবার
ব্যক্তিজীবনে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বেগম বিলকিস আক্তার হোসেনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। তাঁদের দুই পুত্র ও এক কন্যা সন্তান রয়েছে। কনিষ্ঠ ছেলে ব্যারিস্টার ড. খন্দকার মারুফ হোসেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন।
৮১তম জন্মদিনে সহকর্মী, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, শুভানুধ্যায়ী ও দাউদকান্দি-মেঘনার সর্বস্তরের মানুষ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ কামনা করছেন।
দৈনিক বাংলাদেশ বুলেটিনের পক্ষ থেকে তাঁর জন্মদিনে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।




