
বাংলামোটরে চাঁদা না পেয়ে বৃহস্পতিবার রাতে ব্যবসায়ী সোহানকে মারধরের মামলায় গ্রেফতার হওয়া সাইমনকে চার দিন ও তার তিন সহযোগীকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহানের আদালত শুনানি শেষে রিমান্ডের এ আদেশ দেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. ইবনে মিজান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত শেষে ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার উপপরিদর্শক মো. নাসিম চার আসামিকে আদালতে হাজির করে আসামিদের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়- ঘটনার সঙ্গে আরও কারা জড়িত, তাদের শনাক্ত ও গ্রেফতারসহ মামলার সংশ্লিষ্ট তথ্য উদ্ধারের জন্য আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। রিমান্ডে নেওয়া অপর তিন আসামি হলেন-ওমর (৩২), মোর্শেদ (২৫) ও মো. শাওন (২৫)।
যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা ফেরদৌস আহমেদ সাইমনের অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ে শুক্রবার সরেজমিন খোঁজখবর নিয়ে আঁতকে ওঠার মতো তথ্য মিলেছে। এই সাইমন রাজধানীর বাংলামোটর এলাকায় আতঙ্কের নাম। এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন পুরো এলাকা। চাঁদাবাজি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জায়গা দখল এবং মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ছিল তার দখলে।
অপরাধ সাম্রাজ্য ধরে রাখতে তিনি তৈরি করেন নিজস্ব ‘টর্চার সেল’ (নির্যাতন কক্ষ)। চাঁদা না দিলে সেখানে নিয়ে ভুক্তভোগীদের করা হতো নির্যাতন। এখনো তার ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না অনেকে।
টর্চার সেল
বাংলামোটর পেট্রোল পাম্পের গলির ভেতরে অবস্থিত ৮০ নম্বর বাসা। ওই বাসার নিচতলার একটি কক্ষ ভাঙারি দোকান হিসাবে ভাড়া দিয়েছিলেন মালিক সাইদুর রহমান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের শেষের দিকে সাইদুর রহমানের কক্ষটি নিজের দখলে নেন ফেরদৌস আহমেদ সাইমন। সেখানেই গড়ে তোলেন ‘টর্চার সেল’। গত ৬ মাসে এই ‘টর্চার সেলে’ প্রায় ২০-২৫ জনকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করেন তিনি।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে বিকাশ ব্যবসায়ী আব্দুর রউফ, ফ্লেক্সিলোড ব্যবসায়ী রিজওয়ান, ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ী রাজু, মুদি ব্যবসায়ী রতন, সেলুন ব্যবসায়ী নাহিদ, হোটেল ব্যবসায়ী মোতাহার, রিকশা ব্যবসায়ী নূরজাহানসহ আরও অনেককে সেই সেলে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন কক্ষটি দেখিয়ে বলেন, ‘এই রুমে বানাইছে আয়নাঘর। এই ঘরে নিয়ে টর্চার করে সবকিছু আদায় করে। মানুষকে মারপিট করে। নির্যাতন করে। এ ধরনের টর্চার কক্ষ বন্ধ না করলে নির্যাতন বন্ধ হবে না।’
ফ্লেক্সিলোড ব্যবসায়ী আব্দুর রব বলেন, কিছুদিন আগে সাইমন আমার রুমে এসে ভাঙচুর চালায়, মারধর করে। পরে আমাকে তার রুমে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে নির্যাতন করা হয়। শুধু আমাকে নয়, সেখানে আরও অনেক মানুষকে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে।
চাঁদার দাবিতে বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় রাজধানীর বাংলামোটরের পেট্রোল পাম্পের গলিতে মো. সোহান নামের একজন ব্যবসায়ীর পথ রোধ করে যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা ফেরদৌস আহমেদ সায়মন ও তার সহযোগীরা। এ সময় কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে সোহানকে পিস্তলের বাঁট দিয়ে মাথায় আঘাত করলে তার মাথা ফেটে রক্ত বের হতে থাকে।
সোহান চিৎকার ও প্রতিবাদ শুরু করলে সায়মন বেশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেন। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দারা এগিয়ে এলে সায়মন তার সহযোগীদের নিয়ে একটি ভবনে প্রবেশ করেন। তখন বাইরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন স্থানীয়রা। এ সময় একটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করেন বিক্ষুব্ধ জনতা। পরে মোটরসাইকেলটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান হাতিরঝিল থানা পুলিশ। এ সময় তাদেরও অবরোধ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে ডিএমপি পুলিশ, ডিবি, এসআরবি ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। বিক্ষোভের মুখে তারাও অনেকটা বেকায়দায় পড়েন।
পরে জনগণের বিক্ষোভের মুখে সাইমনসহ চারজনকে আটক করে হাতিরঝিল থানায় নেওয়া হয়।




