
বাংলাদেশে বর্তমানে মাশরুম চাষ একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও লাভজনক কৃষি খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও এর রপ্তানি সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অল্প পুঁজি, কম জমি ও স্বল্প সময়ে উৎপাদন করা সম্ভব হওয়ায় তরুণ ও শিক্ষিত নতুন উদ্যোক্তারা মাশরুম চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
বৈদেশিক বাজারে মাশরুমের আন্তর্জাতিক চাহিদা রয়েছে। ফলে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এখন বিদেশেও মাশরুম রপ্তানির সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখবেন।
মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট এবং বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে চাষীদের গুণগত মানের স্পন (বীজ), আধুনিক প্রযুক্তি এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
মাশরুমে উচ্চমাত্রার প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান থাকায় এবং কোলেস্টেরল না থাকায় স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যে এর ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা আরও জোরদার করা গেলে মাশরুম খাত দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে বলে একাধিক মাশরুম চাষিও উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।
ঢাকার কেরানিগজ্ঞের কদমতলী খোলামোড়ার লাবনী আক্তার নামের এক নারী উদ্দোক্তার সাথে কথা হয় তিনি জানান, গত তিন বছর ধরে তিনি মাশরুম নিয়ে কাজ করছেন। এর আগে তিনি মহিলা বিষযক অধিদপ্তরের জিআই প্রকল্পে কাজ করতেন প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কারনে তিনি অনেকটাই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন মা আর একমাত্র ছোট্র সন্তান কে নিয়ে কি করবেন? এর থেকই মুলত তিনি মাশরুম উদ্দোক্তার হওয়ার জন্য কাজ শুরু করেন।
তিনি জানান, মাশরুম নিয়ে কাজ করার আরেকটি প্রধান কারন হলো এই খাবারটি প্রথমত নির্ভেজাল, প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি এবং অল্প পুঁজিতে ঘরোয়া পদ্ধতিতেই সহজে চাষাবাদ করা যায়। তার বাসায় নীচতলায় তৈরি করেন মাশরুমের স্পন বা বীজ। তারপর সারাদেশে অনলাইনে এবং অফলাইনে তিনি তা বিক্রি করে সংসার সামলান।
কথা হয় সাভারের রেডিও কলোনির বাসিন্দা ও মাশরুম উদ্যোক্তা, পাপিয়া আক্তারের সঙ্গে তিনি জানান,২০১৩ সালে মাত্র ১০ হাজার টাকা নিয়ে এই ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ২০১৪ সালে মাশরুম বানিজ্যিক ভাবে চাষাবাদ শুরু করেন। তিনি জানান মাশরুম চাষ ও বিক্রির আয়ে মেয়েকে চিকিৎসক বানিয়ে এবং ছেলে কে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেছেন।
বর্তমানে তাঁর ‘পাপিয়া মাশরুম খামার’-এর সঙ্গে ৬-৮ জন চাষি যুক্ত। তিনি নিজেই স্পন উৎপাদন, মাশরুম চাষ এবং বাজারজাতকরণের কাজ করেন। মৌসুমভেদে প্রতি মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার মাশরুম বিক্রি করেন। পাপিয়া বলেন, ‘ঘরের ভেতর, বারান্দা কিংবা পরিত্যক্ত জায়গাতেও মাশরুম চাষ করা যায়। নারীদের জন্য এটি খুবই উপযোগী একটি উদ্যোগ। আমি চাই, আরও বেশি নারী এই খাতে এগিয়ে আসুক।
গাজীপুর জয়দেবপুরের কানাইয়া এলাকার আরেক নারীর উদ্যোক্তা সালমা আক্তার জানান, তিনি একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করতেন বছর খানিক আগে সেই কোম্পানির চাকরি ছেড়ে মাশরুমের উপর ১১ দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন। তিনি বলেন মাশরুম দিয়ে বিভিন্ন প্রজাতির মুখরোচক খাবার তৈরি করে তা বিভিন্ন জায়গায় এবং অফলাইন অনলাইনে বিক্রি করে তার পুরো সংসার চালাচ্ছেন। এবং মাস শেষে তিনি ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার মতো আয় করছেন তিনি সবার সহযোগিতা আরো বড় উদ্যোক্তা হতে চান ।
পাপিয়া আক্তার, লাবন্য বা সালমার মতো আরও অনেকের জীবন মাশরুমে বদলে গেছে। অথচ একসময় মাশরুম ছিল শহরের কিছু রেস্তোরাঁ ও সুপারশপের পরিচিত একটি খাদ্য। এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য হিসেবে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। মাশরুম চাষে উর্বর জমির প্রয়োজন হয় না, স্বল্প পুঁজিতে শুরু করা যায় এবং মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উৎপাদন পাওয়া সম্ভব। ফলে নারী, তরুণ এবং শিক্ষিত বেকারদের মধ্যে মাশরুম চাষে আগ্রহ বাড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্পের পরিচালক ড. আখতার জাহান কাঁকন জানান, বর্তমানে দেশের ৩৩টি হর্টিকালচার সেন্টার, মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট এবং ১৬০টি উপজেলায় এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৬০০ উদ্যোক্তা এবং ১৮ হাজার দলভুক্ত চাষি তৈরি হয়েছে। নতুন ৩৫টি জার্মপ্লাজম সংগ্রহ, ১৮টি উৎপাদন প্রযুক্তি এবং ২৫টির বেশি প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করা হয়েছে। রয়েছে মান নিয়ন্ত্রণে নিজস্ব ল্যাবও।
আখতার জাহান কাঁকন বলেন, এটি পুষ্টির চাহিদা পূরণ এবং কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির পথ দেখাচ্ছে। ওয়েস্টার, মিল্কি, কান ও ঋষি (রেইশি) মাশরুমের বাণিজ্যিক উৎপাদন বাড়ছে। অনেক উদ্যোক্তা এখন কৃষি পর্যটন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, টিস্যু কালচার ও রেস্তোরাঁভিত্তিক ব্যবসাও শুরু করেছেন।
আখতার জাহান জানান, প্রকল্প শেষ হলেও বীজ উৎপাদন ও গবেষণা যেন বন্ধ না হয়, সে জন্য ৩৩টি হর্টিকালচার সেন্টারকে মাতৃবীজ উৎপাদনের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে উদ্যোক্তারা ভবিষ্যতেও সহজে মানসম্মত স্পন পাবেন।
এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম বাংলাদেশ বুলেটিন কে বলেন, মাশরুম একটি নিরাপদ খাদ্যে। পাশাপাশি মাশরুম চাষ করতে খুব জায়গা লাগেনা আধো আলো আধো ছায়াতেও চাষ করা যায়। পুষ্টি জোগান বাড়ানো এবং নারী ও তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান প্রেক্ষাপটে মাশরুম একটি পরিবেশবান্ধব কৃষি উদ্যোগ। এতে উর্বর জমির প্রয়োজন হয় না, কৃষিজ ও বনজ বর্জ্য ব্যবহার করে উৎপাদন সম্ভব এবং তুলনামূলক কম পানি লাগে। মাশরুমে ঔষধি গুণ রয়েছে পাশাপাশি বর্তমানে বিদেশে রপ্তানি করার সুযোগ রয়েছে আর মাশরুমের অনেক উদ্যোক্তা রয়েছে এইজন্য এই বিষয়টাকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।




