
রাজধানীর ধানমন্ডি লেকের নাব্যতা, পরিবেশ ও নান্দনিকতা ফিরিয়ে আনতে পুনঃখনন (ড্রেজিং) ও উন্নয়নকাজ শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। দীর্ঘদিনের জমে থাকা কাদা ও বর্জ্য অপসারণের পাশাপাশি লেকের অবকাঠামো আধুনিকায়ন, সৌন্দর্যবর্ধন এবং নতুন বিনোদন সুবিধা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে ধানমন্ডি লেক পুনঃখনন কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহন মন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ রবিউল আলম।
ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, ৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও গড়ে ৫৬ মিটার প্রশস্ত ধানমন্ডি লেক থেকে প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার ৫৩৪ ঘনমিটার স্লাজ বা কাদা-বর্জ্য অপসারণ করা হবে। প্রতিদিন প্রায় ৭০০ ঘনমিটার স্লাজ অপসারণের লক্ষ্যে দুটি ভাসমান এক্সকাভেটর ও চারটি বার্জ ব্যবহার করা হবে। প্রায় এক বছর ধরে চলবে পুনঃখননকাজ। এ পর্যায়ের প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২৬ কোটি টাকা।
১৯৬০-এর দশকে পুরোনো পাণ্ডু নদীর অবশিষ্টাংশকে কেন্দ্র করে ধানমন্ডি লেকের সৃষ্টি হয়। প্রায় ৮৬ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এ এলাকায় বর্তমানে জলাশয়ের পরিমাণ প্রায় ৫৫ একর।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ধানমন্ডি লেকের সার্বিক উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা তার নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে দুটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন। এর প্রথম ধাপ হিসেবে লেকের স্লাজ অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে। ডিটেইল ডিজাইন অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে পুরো লেক সংস্কার করা হবে।
তিনি লেকের পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষায় দর্শনার্থী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন থাকার আহ্বান জানান।
ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, লেকের তলদেশ পরিষ্কারের পর পানি শোধন, সাইডওয়াল সংস্কার, ওয়াকওয়ে আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ, সৌন্দর্যবর্ধন এবং আলোকসজ্জার কাজ শুরু হবে। পাশাপাশি শিশুদের জন্য স্পিডবোটের ব্যবস্থা, ধানমন্ডি এলাকার রাস্তা-ফুটপাতসহ সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, রবীন্দ্র সরোবরের আদলে ধানমন্ডি লেকে ‘নজরুল সরোবর’ নামে একটি আধুনিক উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা হবে।
বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া জলাবদ্ধতা, অবকাঠামোগত ক্ষয় ও পরিবেশগত ক্ষতি কাটিয়ে ধানমন্ডি লেককে পুনরুজ্জীবিত করে আধুনিক বিনোদনকেন্দ্রে রূপ দিতে ডিএসসিসি মোট ৭৫ কোটি টাকার একটি মাস্টারপ্ল্যান হাতে নিয়েছে।
এর মধ্যে লেক ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সংস্কারে ৫০ কোটি টাকা এবং ‘নজরুল সরোবর’ বা ‘বিদ্রোহী চত্বর’ নির্মাণে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে।
পরিকল্পনার আওতায় লেকের পাড় সুরক্ষা ও ঢাল স্থিতিশীল করা, আধুনিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা, হাঁটার পথ সংস্কার, আলোকসজ্জা, সীমানাবেষ্টনী ও নিরাপত্তা রেলিং মেরামত করা হবে। পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদারে সিসিটিভি ক্যামেরা, এনাউন্সমেন্ট সিস্টেম ও নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করা হবে।
লেককেন্দ্রিক বিনোদন সুবিধা বাড়াতে তিনটি ভাসমান ডেক, কিয়স্ক, আধুনিক জিম, ক্যাফেটেরিয়া, ব্যাডমিন্টন কোর্ট, উন্মুক্ত ব্যায়ামাগার ও পার্কিং সুবিধা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিবেশ ও নাগরিকসেবার অংশ হিসেবে উদ্ভিদের চিকিৎসায় বিশেষায়িত ‘ট্রি হাসপাতাল’, নিরাপদ খাবার পানি এবং জনবান্ধব শৌচাগারও নির্মাণ করা হবে।
কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের ঠিক বিপরীতে ধানমন্ডির ১৩/এ ও ৮/এ সড়কের পাশে ৫০ দশমিক ৯৬৭ কাঠা জমিতে প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘নজরুল চত্বর’ বা ‘বিদ্রোহী চত্বর’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি হবে ধানমন্ডি লেকের নতুন সাংস্কৃতিক ও বিনোদনকেন্দ্র।
এখানে নজরুলসংগীত, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনা আয়োজনের জন্য উন্মুক্ত অ্যাম্ফিথিয়েটার ও গ্রিনরুম থাকবে। পাশাপাশি কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, সাহিত্যকর্ম ও বিদ্রোহী চেতনা তুলে ধরতে বুক কর্নার, লাইব্রেরি, তথ্যফলক, নগর বন, প্লাজা ও লেকের ঘাট নির্মাণ করা হবে।
এ ছাড়া কবি কাজী নজরুল ইসলামের পছন্দের খাবার পরিবেশনের জন্য বিশেষ রেস্তোরাঁ ও ক্যাফে রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ডিএসসিসি জানিয়েছে, লেকের তলদেশ স্লাজমুক্ত করার কাজ শেষ হওয়ার পরপরই মূল সংস্কারকাজ এবং ‘নজরুল সরোবর’ নির্মাণের কাজ একযোগে বাস্তবায়ন করা হবে। এর মাধ্যমে ধানমন্ডি লেককে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও নাগরিকদের জন্য আকর্ষণীয় বিনোদনকেন্দ্রে রূপ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।




