
আন্তর্জাতিক ফুটবলে লিওনেল মেসির অধ্যায়ের সমাপ্তির ঘোষণা যেন ছুঁয়ে গেছে পুরো ক্রীড়াঙ্গনকে। আর্জেন্টাইন মহাতারকার বিদায়ে সতীর্থ, সাবেক ক্লাব, প্রতিদ্বন্দ্বী দল থেকে শুরু করে ফুটবলের বাইরের বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠনও যখন আবেগ ও শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে তাকে, তখন ব্যতিক্রম বার্সেলোনা। যে ক্লাবের ইতিহাসের সঙ্গে মেসির নাম প্রায় সমার্থক, সেই ক্লাবই তার আন্তর্জাতিক অবসর উপলক্ষে এখনো প্রকাশ করেনি কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি মন্তব্যও পরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মেসি। তার সিদ্ধান্তের পরপরই ফুটবল বিশ্বজুড়ে শুরু হয় স্মৃতিচারণ ও শ্রদ্ধা জানানোর ঢল। দীর্ঘ দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে আর্জেন্টিনার হয়ে একের পর এক সাফল্য অর্জন করা মেসির বিদায়কে তাই ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন সমর্থক ও সংশ্লিষ্টরা।
মেসির অবসরের ঘোষণার পরপরই তাকে শুভেচ্ছা জানায় তার সাবেক ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। ফরাসি ক্লাবটিতে মাত্র দুই মৌসুম কাটালেও মেসির বৈশ্বিক প্রভাব এবং ফুটবলে তার অসামান্য অবদানের কথা স্মরণ করে শ্রদ্ধা জানায় পিএসজি।
শুধু সাবেক ক্লাবই নয়, মেসির সঙ্গে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই, এমন অনেক ক্লাবও তার বিদায়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। বায়ার্ন মিউনিখ, নাপোলি ও অগসবুর্গের মতো ক্লাবের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও উঠে এসেছে মেসির নাম। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের পেশাদার বাস্কেটবল লিগের বিভিন্ন অফিশিয়াল প্ল্যাটফর্ম থেকেও এসেছে তাকে ঘিরে প্রতিক্রিয়া।
এই আবেগঘন মুহূর্তেই ব্যতিক্রম বার্সেলোনা। ২০০৫ থেকে ২০২১ দীর্ঘ ১৬ বছর কাতালান ক্লাবটির জার্সিতে খেলেছেন মেসি। এই সময়েই তিনি হয়ে উঠেছেন বার্সেলোনার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তার নেতৃত্ব ও অসাধারণ পারফরম্যান্সে ক্লাবটি জিতেছে একের পর এক ঘরোয়া ও ইউরোপীয় শিরোপা।
তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলার পর বার্সেলোনার অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেসিকে নিয়ে আলাদা কোনো শ্রদ্ধাবার্তা দেখা যায়নি। অবশ্য পুরোপুরি নিশ্চুপও ছিল না ক্লাবটি।
মেসি অবসরের ঘোষণা দিয়ে ইনস্টাগ্রামে যে পোস্ট দেন, সেখানে বার্সেলোনার অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে একটি মন্তব্য করা হয়েছিল। মন্তব্যে তার দীর্ঘ অবদান নিয়ে গর্বের কথা জানানো হয়। কিন্তু কিছু সময় পরই সেই মন্তব্যটি মুছে ফেলে ক্লাবটি।
আর এই ঘটনাই জন্ম দিয়েছে নতুন প্রশ্নের। কেন মেসির মতো একজন কিংবদন্তির বিদায়ের মুহূর্তে বার্সেলোনার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বার্তা এল না? কেনই বা প্রকাশ করা মন্তব্যটি পরে সরিয়ে নেয়া হলো?
বার্সেলোনা ও মেসির সম্পর্ক যে এখন আর আগের জায়গায় নেই, সেটি অবশ্য নতুন কোনো বিষয় নয়। ২০২১ সালে ক্লাবটির সঙ্গে চুক্তি নবায়ন না হওয়ায় মেসিকে বার্সেলোনা ছাড়তে হয়েছিল। সেই বিদায়ের সংবাদ সম্মেলনে আবেগ ধরে রাখতে না পারা মেসির ছবি আজও ফুটবলপ্রেমীদের মনে দাগ কেটে আছে।
সবচেয়ে নাটকীয় বিষয় ছিল, বিদায়ের ঠিক আগের সময় পর্যন্তও মেসির বার্সেলোনায় থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছিল। শেষ পর্যন্ত আর্থিক ও চুক্তিগত জটিলতায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। মেসিকে পিএসজিতে পাড়ি দিতে হয়।
এরপর সময় গড়িয়েছে, মেসি পিএসজি হয়ে পাড়ি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মায়ামিতে। কিন্তু বার্সেলোনার সঙ্গে তার সম্পর্কের আবেগ মুছে যায়নি। তাই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে তার বিদায়ের মতো ঐতিহাসিক মুহূর্তে ক্লাবটির নীরবতা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর লেগেছে। মেসির বিদায়ে যখন ফুটবল বিশ্ব একসঙ্গে তার অবদান স্মরণ করছে, তখন বার্সেলোনার এই নীরবতা যেন পুরোনো এক অধ্যায়ের অমীমাংসিত আবেগকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।




