
একটি আইফোন,কারও কাছে শখের বস্তু, কারও কাছে আধুনিকতার প্রতীক, আবার কারও কাছে সামাজিক মর্যাদার অংশ। কিন্তু সেই আইফোনকে ঘিরেই ২২ দিনের মাথায় দেশের দুই প্রান্তে ঘটে গেল দুটি মর্মান্তিক ঘটনা। একটি ঘটনায় আইফোন কেনার টাকা জোগাড় করতে ১৫ মাসের শিশুকে এক লাখ টাকায় বিক্রির অভিযোগ উঠেছে বাবার বিরুদ্ধে। আরেক ঘটনায় মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর উদ্ধার হয়েছে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতীমের মরদেহ।
ঘটনা দুটি সম্পূর্ণ আলাদা। স্থানও আলাদা, পরিবারও আলাদা। কিন্তু দুই ঘটনার কেন্দ্রেই রয়েছে একটি আইফোন,আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে দুটি পরিবারের অসহায়তা, শোক ও প্রশ্ন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে অপ্রতীমের বয়স মাত্র ১৩ বছর। কুমিল্লা বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী শুক্রবার বিকেলে কোটবাড়ির বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল।
সাধারণ একটি বিকেল। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলা, কিছুটা সময় বাইরে থাকা,তারপর ঘরে ফেরার কথা। কিন্তু সেই ফেরাটা আর হয়নি।
অপ্রতীম নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছেলেকে খুঁজে পেতে আকুতি জানান তার মা। তিনি জানান, মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হওয়ার পর আর বাড়ি ফেরেনি অপ্রতীম।
নিখোঁজের পর তার মুঠোফোনের সর্বশেষ অবস্থান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন সামাজিক বনায়ন এলাকায় শনাক্ত হয়। শনিবার ভোরে সেখানে তল্লাশি চালান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে তারা একটি মরদেহ দেখতে পান। পরে পুলিশ গিয়ে সদর দক্ষিণ উপজেলার পশ্চিম সানন্দা এলাকায় ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের পেছনের একটি টিলা থেকে মরদেহ উদ্ধার করে।
যে ছেলেটিকে বাঁচানোর জন্য মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন, কয়েক ঘণ্টা পর সেই ছেলেকেই পাওয়া গেল নিথর অবস্থায়।
কুমিল্লার ঘটনার খবরের মধ্যেই সামনে আসে গতো মাসে এই আইফোনের আরেকটি আলোচনার ঘটনা ঘটেছে গত মাসের ২৯ আগস্টে পটুয়াখালীর দশমিনার আরেকটি ঘটনা। সেখানে আইফোন কেনার টাকা জোগাড় করতে নিজের ১৫ মাস বয়সী ছেলে জাহিদুল ইসলাম মুছাকে এক লাখ টাকায় বিক্রির অভিযোগ উঠেছে তার বাবা মারুফ মুন্সির বিরুদ্ধে।
মারুফ পেশায় কাটমিস্ত্রির শ্রমিক। অভিযোগ অনুযায়ী, আইফোন কেনার জন্য তিনি একই উপজেলার ইমরানের কাছে শিশুটিকে এক লাখ টাকায় বিক্রি করেন। পরে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে ইমরানের শ্বশুর মাহবুল গাজীর কাছ থেকে ৫২ হাজার টাকা অগ্রিম নিয়ে একটি পুরোনো আইফোন কেনেন তিনি।ঘটনাটি জানাজানি হলে গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস এলাকা থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে দশমিনা থানা-পুলিশ। একই ঘটনায় শিশুটির বাবা মারুফকে ঢাকায় আটক করা হয়।
তবে পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় এবং শিশুটির ভবিষ্যতের বিষয় বিবেচনায় লিখিত মুচলেকা নিয়ে মারুফকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে রোববার রাত দেড়টার দিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদ হাসান মৃধা শিশুটিকে তার দাদা মো. মফিজ মুন্সি ও দাদি মাহফুজা বেগমের কাছে হস্তান্তর করেন।
দুটি ঘটনা পাশাপাশি রাখলে প্রশ্ন জাগে,একটি প্রযুক্তিপণ্য কীভাবে কখনো শখ, কখনো সামাজিক আকাঙ্ক্ষা আর কখনো পরিবারের জন্য এত বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে?
অপ্রতীমের ঘটনা সম্পর্কে তার নিখোঁজ হওয়ার পর আইফোন সঙ্গে থাকার বিষয়টি পরিবার জানিয়েছে। তবে তার মৃত্যুর কারণ বা কীভাবে মৃত্যু হয়েছে, তা তদন্তের বিষয়। অন্যদিকে দশমিনার ঘটনায় জাহিদুল ইসলাম মুসার বাবার বক্তব্য অনুযায়ী, আইফোন কেনার অর্থ জোগাড় করতেই শিশুটিকে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
তাই ঘটনা দুটিকে এক সুতোয় বাঁধার আগে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা জরুরি,দুটির পেছনের পরিস্থিতি এক নয়। একটি হলো নিখোঁজের পর কিশোরের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা, অন্যটি শিশুকে বিক্রির অভিযোগ। কিন্তু উভয় ঘটনাতেই আইফোনের উপস্থিতি কাকতালীয়ভাবে দুটি পরিবারের জীবনে গভীর সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।
আজকের সময়ে স্মার্টফোন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ছবি তোলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিনোদন কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দ,সবকিছুর সঙ্গেই এটি জড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে আইফোনের মতো দামি ডিভাইস অনেকের কাছে আকাঙ্ক্ষার বস্তু।
কিন্তু কুমিল্লার অপ্রতীম আর দশমিনার ছোট্ট মুছার গল্প মনে করিয়ে দেয়,একটি ডিভাইস কখনোই একটি জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না।
একজন আর ফিরল না মায়ের কাছে। আরেকজন ফিরে এসেছে পরিবারের কাছে,তবে তাকে ঘিরে থেকে গেছে এক গভীর প্রশ্ন ও এক মর্মান্তিক অভিযোগ।
দুটি ঘটনা তাই শুধু আইফোনের গল্প নয়। এটি আমাদের চারপাশের সামাজিক বাস্তবতা, পারিবারিক সচেতনতা, শিশুদের নিরাপত্তা এবং ভোগের আকাঙ্ক্ষার সীমা নিয়েও ভাবার সুযোগ করে দেয়। কারণ প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্য; মানুষের জীবনের মূল্য নির্ধারণ করার জন্য নয়।




