
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিকর্ম, দর্শন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে দেশব্যাপী নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে ‘নজরুল বর্ষ’। সরকারি উদ্যোগে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আয়োজন করা হচ্ছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি। এরই মধ্যে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় নজরুল বর্ষের স্থানীয় আয়োজন নিয়ে দেখা দিয়েছে আক্ষেপ।
স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীদের অভিযোগ, দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে নজরুল সংগীত ও শুদ্ধ সংগীতচর্চায় অবদান রাখা তেঁতুলিয়ার কৃতী সন্তান, নজরুলসাধক, সুরকার ও সংগঠক তজিরুল ইসলামকে স্থানীয় সরকারি ও প্রশাসনিক আয়োজনে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা হয়নি এই গুনী শিল্পীকে । জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন স্বীকৃতি ও সম্মাননা পাওয়া এই শিল্পী নিজ এলাকায় নজরুল বর্ষের আয়োজনে উপেক্ষিত থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিবর্গ।
জানা যায়, তেঁতুলিয়ার প্রান্তিক জনপদে বেড়ে ওঠা তজিরুল ইসলাম প্রায় পাঁচ দশক ধরে সংগীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত এই নজরুলসাধক । জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের শুদ্ধ সুর ও সংগীতের প্রচার-প্রসারে দীর্ঘদিন নিয়মিত কাজ করছেন তিনি। নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে দুই বছর মেয়াদি উচ্চতর বিশেষ ডিপ্লোমা সম্পন্নকালে তিনি সুধীন দাস, সোহরাব হোসেন ও খালিদ হোসেনের মতো বরেণ্য সংগীতজ্ঞের সান্নিধ্য লাভ করেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত এই শিল্পী সংগীত পরিচালক ও সুরকার হিসেবেও বর্তমানেও কাজ করছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ নজরুল সংগীত শিল্পী পরিষদের জাতীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে তজিরুল ইসলাম একাধিক পদক ও সম্মাননা পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে শুদ্ধ সংগীত চর্চা পদক, শুদ্ধ নজরুল সংগীত প্রশিক্ষণ পদক, চলচ্চিত্র অভিনেতা খলিলুল্লাহ স্মৃতি পদক এবং বাংলাদেশ সংস্কৃতি পরিষদের সম্মাননা। তেঁতুলিয়া সংগীত বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবেও তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশ ধ্রুব পরিষদের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানটি একাধিকবার শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। একই সংগঠনের পক্ষ থেকে তজিরুল ইসলাম শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছেন।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের আয়োজনে লোকসংগীতের একটি বিশেষ প্রকল্পে জাতিসংঘের সমর্থিত অডিও ক্যাসেটে গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী হিসেবে কাজ করার স্বীকৃতিও রয়েছে এই গুনী শিল্পীর ।
শিক্ষকতা ও সংগীতচর্চার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়েও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছেন তজিরুল ইসলাম। রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে প্রায় ১৪ বছর সংগীত শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর বর্তমানে উত্তরা কে.সি. মডেল কলেজে সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন তিনি।
২০২৪ সালে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে তার একক সুরে ‘সুরে সুরে মন পবন’ শীর্ষক মৌলিক গানের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া করোনা-পরবর্তী সময়ে পঞ্চগড়ে ‘আদি-সুরে নজরুল সংগীত চর্চা’ শীর্ষক কর্মশালা পরিচালনা করে স্থানীয় শিল্পীদের শুদ্ধ নজরুল সংগীতের প্রশিক্ষণ দেন নজরুলসাধক ।
স্থানীয় সংস্কৃতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে সংগীতচর্চা ও নজরুল সংগীতের প্রসারে অবদান রাখা এমন একজন গুনী শিল্পীকে তার নিজ এলাকার সরকারি সাংস্কৃতিক আয়োজনে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত না করা দুঃখজনক। তাদের মতে, নজরুল বর্ষের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে স্থানীয় গুণী শিল্পীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হলে একদিকে যেমন তাদের সম্মানিত করা হয়, অন্যদিকে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গেও জাতীয় আয়োজনের একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি হয়।
তাদের দাবি, প্রশাসনিক সমন্বয় বা যোগাযোগের কোনো ঘাটতি থাকলে তা দূর করে তজিরুল ইসলামের মতো স্থানীয় গুণী ও নিবেদিতপ্রাণ শিল্পীদের নজরুল বর্ষের কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করা হোক। একই সঙ্গে তেঁতুলিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করতে স্থানীয় শিল্পীদের যথাযথ মূল্যায়ন ও সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা ।
উপজেলা শিল্পকলার সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম মিঞা বলেন তজিরুল ইসলাম গুনী শিল্পী তার সংগীতের উপর অসম্ভব রকম দখল রয়েছে । তেতুলিয়া সংগীত বিদ্যলয়ের সাধারণ সম্পাদক সাদিকুল ইসলাম বলেন তজিরুল ইসলাম তেতুলিয়া সংগীত বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ থাকাকালীন সময়ে একাধিকবার ধ্রুব পরিষদ থেকে শ্রেষ্ঠ সংগীত বিদ্যালয় এবং শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।




