
সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের কারণে গত দুই মাসে দেশের কোনো পোশাক কারখানা বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, গত কয়েক দিনের তুলনায় বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। ‘বাটেক্সপো ২০২৬’, হংকং রোডশো এবং দেশের পোশাকশিল্পের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, জ্বালানি সংকটের প্রকৃত প্রভাব এখনই পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এর অভিঘাত বুঝতে আরও অন্তত তিন থেকে চার মাস সময় লাগতে পারে। কারণ কোনো কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হয় না। পাইপলাইনে থাকা অর্ডার সম্পন্ন করা, শ্রমিকদের আইনগত পাওনা পরিশোধ এবং ব্যাংকসহ বিভিন্ন দায়দায়িত্ব নিষ্পত্তির মতো বিষয় জড়িত থাকে।
তিনি বলেন, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ডাইং, ওয়াশিংসহ পোশাকশিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। তবে সম্প্রতি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর শিল্পে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পর থেকেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
বিজিএমইএ সভাপতি জানান, স্বাভাবিক সময়ে পোশাক কারখানায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা কাজ হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয়েছে। পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। তারপরও সময়মতো রপ্তানি পণ্য পাঠাতে উদ্যোক্তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে একটি প্রেজেন্টেশন দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী দুই বছরের মধ্যে জ্বালানি সমস্যার বড় ধরনের সমাধান সম্ভব বলে তারা মনে করেন।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য স্থলভিত্তিক গ্যাস স্টোরেজ টার্মিনাল নির্মাণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন সংগঠনটির সভাপতি।
তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে জি-টু-জি ভিত্তিতে একটি এফএসআরইউ আনার চুক্তি হয়েছে। তবে একাধিক এফএসআরইউ স্থাপনের পাশাপাশি গ্যাস বিতরণব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। শুধু টার্মিনাল বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না।
এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে গ্যাস সংযোগ ও রেশনিংয়ে অগ্রাধিকার, ১০০ থেকে ৫০০ পিএসআই বয়লারসম্পন্ন কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সংযোগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে কম সুদের ‘গ্রিন লোন’ এবং উপকূলীয় এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারের দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ।
সংবাদ সম্মেলনে পোশাকশিল্পে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। মাহমুদ হাসান খান জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমানে প্রায় ১৪ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি রিটার্ন এবং উচ্চ সুদের হার এ খাতে বিনিয়োগের বড় বাধা। এ কারণে কম সুদের গ্রিন ফাইন্যান্সের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার সরকারি উদ্যোগকে ব্যবসায়ী মহলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন বিজিএমইএ সভাপতি। তাঁর মতে, অতিরিক্ত সময় পাওয়া গেলে এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারবে।
তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) গুরুত্বপূর্ণ। বিজিএমইএর অগ্রাধিকার জিএসপি প্লাসের পরিবর্তে ইইউর সঙ্গে এফটিএ অর্জন। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাজ করছে এবং আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে বলেও জানান তিনি।
ব্যবসা সহজ করতে কোম্পানি ও কাস্টমস আইন আধুনিকায়ন, দ্রুত এফটিএ/ইপিএ সম্পাদন এবং এলডিসি-পরবর্তী সময়ে অন্তত পাঁচ বছরের জন্য রপ্তানি খাতে বিশেষ নীতিগত সহায়তা ও শুল্ক-কর কাঠামোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দাবিও জানিয়েছে বিজিএমইএ।
রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণের বিষয়ে মাহমুদ হাসান খান বলেন, বর্তমানে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানির মধ্যে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডার বাইরের বাজার থেকে আসে। নতুন বাজার সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে হংকংয়ে অনুষ্ঠেয় রোডশোতে আন্তর্জাতিক নতুন ব্র্যান্ডগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে।
জাপানের বাজারে রপ্তানি বাড়াতে বিজিএমইএ ‘জাপান ডেস্ক’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের জাপানমুখী পোশাক রপ্তানি আগামী দিনে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে শুধু কম দামের পণ্য উৎপাদনকারী শিল্প হিসেবে নয়, বরং উদ্ভাবননির্ভর ও আধুনিক শিল্প হিসেবে বিশ্ববাজারে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের সঙ্গে কৌশলগত চুক্তির উদ্যোগের কথাও জানানো হয়।




